বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ, ২০১৭, ০২:৩৬:৩৮

শিশুদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবেন না

শিশুদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবেন না

জেসমিন চৌধুরী : আজ সকালে বিবিসি রেডিওতে যে আলোচনা ঘুরে ফিরে আসছিল তা হচ্ছে পরীক্ষা-ভিত্তিক পড়াশোনার চাপের কারণে ছাত্রদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

আলোচনায় অংশ নিচ্ছিলেন শিক্ষক, চিকিৎসক, মা-বাবা, এমনকি মনোবিজ্ঞানীরাও। বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কমানোর ফলে ছাত্রদের অনুপাতে শিক্ষকের সংখ্যা হ্রাস,

অনেক ক্ষেত্রে স্পেশাল-নিড বাচ্চাদের জন্য ওয়ান-টু-ওয়ান সহযোগিতা প্রত্যাহার, এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা কমে যাওয়াতে ছাত্রদের আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নেতিবাচক পরিবর্তন লক্ষিত হচ্ছে।

এই সবকিছুর মধ্যে আশার কথা হচ্ছে এসব নিয়ে বিভিন্ন মহলের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, এবং তারা খোলামেলা ভাবেই এই বিষয়ে আলোচনা করছেন। নিজের স্কুলের বাচ্চাদের উপর এই পরিস্থিতির অশুভ প্রভাবের কথা বলতে গিয়ে সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকদেরকে ঊর্ধ্বতন মহলের উষ্মার শিকার হতে হচ্ছে না, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি চাকুরেরাও নির্ভয়ে প্রাণখুলে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারছেন, মা-বাবারা এই ব্যর্থতার দায় বাচ্চাদের ওপরে চাপিয়ে না দিয়ে আসল সমস্যা কী তা বুঝবার চেষ্টা করছেন।

যেসব সার্ভিস কমে যাওয়ার কারণে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটা সংকটজনক অবস্থা দেখা দিয়েছে, আমাদের দেশে সেসব সার্ভিস কোনো কালেই ছিল না, আজো নেই। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে চিরদিনই শিক্ষকের সংখ্যা অপ্রতুল, ক্লাসে ছাত্রের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি, দুর্বল ছাত্রদের জন্য বাড়তি সাহায্যের ব্যবস্থা নেই। তদুপরি, শিক্ষাদানের প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবের গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত কাজ করে শিক্ষকদের অদক্ষতা, এবং শিক্ষাপদ্ধতিতে বৈচিত্র্যের অভাব।

শিক্ষকরা উপযুক্ত বেতন পান না বলেই হয়তো প্রশিক্ষণ লাভ করলেও পড়ানোর ক্ষেত্রে ধৈর্য্য এবং বিচক্ষণতা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হন, অথচ এই সমস্ত অভাবের যোগফলের ব্যর্থতার দায় শিক্ষার্থীদেরকেই বহন করতে হয়।

এই সমস্যাগুলো সম্পর্কে সচেতনতা যে একেবারেই নেই তা বলবো না কিন্তু সমাধানের পথ সীমিত এবং কঠিন বলেই বোধ হয় দায়ভারটা নিতে হয় সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে অসহায়, এবং এই ঘূর্ণির কেন্দ্রবিন্দুতে বসে থাকা ছাত্রদেরকেই। তাদের ওপরে আরো বেশি করে পড়ার চাপ দেয়া হয়, ভাল করতে না পারার জন্য দোষারোপ করা হয়। তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে বড় মাপের কোনো আলোচনাও খুব একটা শোনা যায় না।

আমার নিজের গল্পটা বলি। আমরা ছোট থাকতে জীবনের অনেক অভাবের সাথে এই চাপের অভাবটা ছিল বড়ই সুখের। ঢেউটিনের চালে ফুটা বিশিষ্ট একটা অখ্যাত গ্রামের স্কুলে পড়তাম আমি, যেখানে রিপোর্ট কার্ড নামক কোনো বিলাসিতার বালাই ছিল না। বছর শেষে স্কুলের মাঠে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে মৌখিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করা হতো, এবং আমি প্রতিবছর শোচনীয়ভাবে ফেল করলেও বাবা স্কুলের একজন পৃষ্টপোষক হওয়াতে শিক্ষকরা প্রতিবছর আমাকে উপরের ক্লাসে তুলে দিতেন।

এরকম করতে করতে ক্লাস ফাইভ থেকে সিক্সে উঠার সময় সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে আমি প্রথমবারের মত নিজ কৃতিত্বে শুধু পাশই করলাম না, বরং পুরো ক্লাসের মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করলাম। ক্লাস এইটে সিলেট শহরের বড় স্কুলে পাঠানো হলো আমাকে, সেখানে ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে আবার সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলাম।

গণ্ডগ্রামের মেয়ে শহরের স্কুলে এসে এমন কাণ্ড করতে পারে? ক্লাস নাইনে সখ করে মানবিক বিভাগে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম- মানবিক বিভাগ থেকে ফার্ট ডিভিশন পাওয়া কঠিন, এই প্রচলিত বিশ্বাস ভেঙে দেয়ার জন্য। ঊনত্রিশ বছর আগের কথা হচ্ছে, সে সময়ে কাজটা আসলেই সহজ ছিল না। বাড়ি থেকে পাঁচ মাইল দূরের স্কুলে যাতায়াতের ঝক্কি সামলে, বাড়ির সর্বশেষ অবিবাহিত মেয়ে হিসেবে নানান দায়িত্ব পালন করে পড়াশোনার সময় তেমন একটা পেতাম না, কিন্তু অল্প পড়েই সব বুঝতে পারতাম দেখে খুব একটা সমস্যাও হতো না।

যাই হোক, এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল যখন বের হলো, দুই বিষয়ে লেটারমার্ক এবং ফার্স্ট ডিভিশন মার্কসহ আমি ফেল করে আবার সবাইকে নতুন করে তাক লাগিয়ে দিলাম। অংকে পেয়েছি একশো’তে মাত্র আটাশ। কী অদ্ভুত ছিল আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি, সব মিলিয়ে এতো ভাল করার পরও একটা বিষয়ে পাঁচ নম্বর কম পেয়ে ফেল করার জন্য একটা বছর পিছিয়ে পড়তে হলো আমাকে, সবগুলো বিষয়ে পরের বছর আবার পরীক্ষা দেবার জন্য প্রস্তুতি নিতে হলো।

আমার বাবা ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দিতে চাইলেন, ‘আমাদের বংশে আজ পর্যন্ত কেউ এসএসসি ফেল করেনি, আমার মেয়ে একটা অসম্ভবকে সম্ভব করেছে’। আব্বা জানতেও পারলেন না তার এসব রসিকতা আমাকে কতটা আঘাত করল। বাসায় মেহমান এলে আমি লুকিয়ে থাকতাম কারণ আমার ব্যর্থতা নিয়ে একটা আলোচনা হবেই। কিছুক্ষণ পর দেখা যাবে আব্বা আমাকে ডেকে বলবেন, ‘তোমার মার্কশিটটা এনে দেখাও তো মা,’ যেন লোকে বুঝতে পারে আমি আসলে ফেল করার মত ছাত্রী নই।

আব্বা বিষয়টাকে সহজভাবে নেবার চেষ্টা করলেও একটা ফেল করা ছাত্রীর প্রতি চারপাশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির কথা আমার অজানা ছিল না। ভীষণ অভিমান হলেও আমি কাউকে বলতে পারলাম না মাসিক ঋতুস্রাবের প্রচণ্ড ব্যথার জন্য অংক পরীক্ষার দিন আমি মনোযোগ দিতে পারিনি, এসব নিয়ে কথা বলা লজ্জার বিষয় ছিল বলে সাহায্যও চাইতে পারিনি কারো কাছে।

কি কষ্ট! কি অপমান! কি একাকীত্ব! কাউকে বুঝাতে পারিনি। শুনেছিলাম কলাপাতা আকৃতির পাতাবাহার গাছের পাতা খুব বিষাক্ত হয়। লুকিয়ে লুকিয়ে সেই পাতার একগ্লাস রস বানিয়ে খেয়েছিলাম আমি। মরিনি বুঝতেই পারছেন, কিন্তু বাজে ধরনের পেট খারাপ হয়েছিল। আরেকবার কয়েকটা কামরাঙা মরিচ চিবিয়ে খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলাম, এসব খবর কেউ জানতো না।

আপনারা অনেকে হয়তো বলবেন, বাংলাদেশে ভাল রেজাল্ট না করলে ভবিষ্যত অন্ধকার। আমি বলব, ভবিষ্যত থাকলে তো অন্ধকার হবে? পড়াশোনার চাপে, খারাপ ফলাফলের ব্যর্থতার হতাশায় একটা শিশু যদি আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, সেটা কি আমাদের সবার ব্যর্থতা হবে না? আমার মতে এই বিষয়টা আমাদের নিজেদের মানসিকতা এবং আলোকিত ভবিষ্যতের সংজ্ঞার ওপরেই নির্ভর করে।

 কাজেই মা-বাবাদের বলছি, জোর করা সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে সন্তানকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবেন না। আমাদের সময়ে পাতাবাহার বা কামরাঙা মরিচের চেয়ে বেশি কিছু সংগ্রহ করা সহজ ছিলনা, এখন সব কিছুই বাচ্চাদের হাতের কাছে।

বোঝাই যাচ্ছে এই সমস্যাটি শুধু আমাদের নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই এই সমস্যা বিদ্যমান। সমাধানের পথ খোঁজার মধ্যেই বোধ হয় তাদের সাথে আমাদের মূল ভিন্নতা। নির্যাতিতের ওপরে দায়ভার চাপানো আমাদের সংস্কৃতির একটা অংশ, এই অপসংস্কৃতির শিকার যেন না হয় আমাদের শিশুরা যারা আমাদের অনাগত ভবিষ্যত।
এমটিনিউজ২৪ডটকম/এম,জে

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে