রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৭, ০১:৫৪:১৯

এ কেমন রসিকতা?

এ কেমন রসিকতা?

ফারহানা নিশি: "আধুনিকতা" শব্দটার ভেতর কিন্তু বেশ একটা ভারিক্কি ব্যাপার রয়েছে। আমরা এই আধুনিক যুগের বাসিন্দা হওয়ায় পারিপার্শ্বিক অনেক ব্যাপারই নিত্যনৈমিত্তিক মনে হয়। কিন্তু এর পেছনের সবকিছুই যে অতটা সহজাত নয়, তা আমাদের ব্যস্ত মস্তিষ্কে ভাববার সময় মেলে না।

আমি, আমরা, সবাই আজকাল সবকিছু সহজেই পেতে চাই। তন্মধ্যে অধিকাংশ পেয়েও যাই। আর সেকারণে অবসর সময়টায় আমাদের প্রয়োজন হয় বিনোদনের। তো বিনোদন পাওয়াটাও যখন আজকাল কঠিন কিছু নয়, তাই আমরা সেটাকে খানিকটা জটিল করেই তুলি। কেননা, "সহজে পাবার মধ্য দিয়ে আত্মতৃপ্তি মেলে না।" তো সেই আত্মতৃপ্তির অন্বেষণে অনেকেই আজকাল বিবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, যা প্রায়শই খানিকটা লোহা হজম করার মতো কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

এর দ্বারাই যদি এ সমাজ, রাষ্ট্র পরিচালিত হয়ে উন্নত হতে চায়, তবে সেগুলো কি আদতেই আমাদের ভবিষ্যতের জন্যে মঙ্গলজনক? নাকি এই অত্যাধুনিকতা দ্বারা প্রতি পদেই ধর্ষিত হচ্ছে আমাদের সমাজব্যবস্থা! হারাচ্ছি আমাদের সভ্যতা, বাঙালিদের সম্মানজনক সেই ঐতিহ্য, সংস্কৃতির পরিচয়?

"লেবু বেশি কচলে তেতো হয়ে যায়"- এটি বড়ই মূল্যবান প্রবাদ। তার সত্যতা অনুধাবন করতে চাইলে আমাদের ব্যস্ত মস্তিষ্কটাকে খানিকটা অবসর দিতে হবে। কেননা, জটিল বিষয়ের হেতু খানিকটা জটিলই হবে। তা বুঝতে ইদের ঢাকার ফাঁকা রাস্তার মতো মস্তিষ্কটাও ক্ষণিকের জন্যে ফাঁকা হওয়া দরকার। খুব বেশি আগের কথা নয়, যখন ছোট ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে কিশোর, তরুণ প্রায় সবাই-ই সাধারণ বিনোদনের বিষয়গুলো থেকেই আনন্দ আস্বাদন করতে চাইতো। কিন্তু দিনে দিনে মানুষের ব্যস্ততা, টেকনোলজির উন্নতি হওয়া সবকিছুর ফলে মানুষ আজকাল কেমন যেন হয়ে উঠেছে।

একটা উদাহরণ দিয়েই বলি, আগে একটা সিনেমা মুক্তি পেলে মানুষ নিজে সেটা হলে গিয়ে দেখতো। তারপর সেটার মান যাচাই করতো। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি এমন যে, অধিকাংশ মানুষ অপেক্ষা করে বাকিরা কখন হলে গিয়ে মুভিটা দেখবে, তারপর সেটা নিয়ে ফেসবুকে মতামত জানাবে। তবে আমরা কেন জানি মাথায় রাখি না, আজকাল প্রশংসাকারীর তুলনায় নিন্দুকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়! তাই কেউ যদি তার উচ্চমার্গীয় ভাষায় কোনো একটা বিষয়ে খারাপ রিভিউ দেন, ব্যস হয়ে গেলো!

অন্যের কথাতেই আমরা নিজে দেখার ব্যাপারটাকে নাকচ করে দেই। কেউ কেউ তো আরও দুই তিন ধাপ এগিয়ে সেই লেখার ভিত্তিতেই আরও দু-চারটে বাজে মন্তব্য করে ফেলেন নিজ চোখে তা প্রত্যক্ষ না করেই। এটা যে শুধু সিনেমার ক্ষেত্রে, তা নয়। বইমেলা এলে বিভিন্ন বইয়ের ক্ষেত্রেও। আসলে আমরা আধুনিকতার পন্হা অনুসরণ করি। আর স্বীয় মানসিকতার স্তরও নামিয়ে দেই কয়েক ধাপ নিচে।

আধুনিকতার প্রসঙ্গ আসলেই পোশাকের বিষয়টা বাদ যায় না। কিন্তু এ বিষয়ে আমি তেমন কোনো মন্তব্যই করতে চাই না। কারণ সে কথা যতই সত্য হোক না কেন, অনেকের কাছে ব্যক্তিগত কারণে তা তিক্তই ঠেকবে। তবে আমার সরল বোধে যা বুঝি, পোশাকের ক্ষেত্রে আধুনিকতার চেয়ে সভ্যতা অনুসরণ করা বেশি জরুরি। বাকিটা আপনাদের বিবেচ্য বিষয়। আধুনিকতার বাজারে একটি বিষয় কিন্তু আজকাল বেশ রমরমা। যাকে কীনা বলা হয় ট্রল (troll)। এর শাব্দিক অর্থ প্রকৃতপক্ষে যা-ই হোক না কেন, ফেসবুকের এই যুগে আমরা এর দ্বারা বিভিন্ন বিষয়ে মজা করা কিংবা ব্যঙ্গ করাকেই বুঝি।

শুরুর দিকে এটি শুধুমাত্রই মজা করার জন্যে হলেও এখন তা অনেকের জন্যেই ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার মতো হয়ে গিয়েছে। আজকের দিনে ট্রল বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যেসব চালানো হচ্ছে এবং যা বেচে অর্থ না হোক অনেকেই সো কলড পপুলারিটি কামাচ্ছেন, তা কি আদৌ সুরুচির পরিচয় দেয়? এই বিষয়টা কিন্তু তারাই গলাধঃকরণ করছেন, যাদের ব্যক্তিগত বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। তবে একটা বিষয় কী, অনেক কিছু জেনেবুঝেও কিন্তু আমরা কাছের মানুষটাকে কষ্ট না দেয়ার ভাবনায় অধিকাংশ সময়ই চুপ থাকি। আর সেটা আমাদের মনুষ্যত্ব রক্ষার্থেই। তো আপনজনের ক্ষেত্রে আমরা যখন এই বিষয়টা মেনে চলি, সমাজের অন্যদের ক্ষেত্রে কেন নয়? তারাও তো কারো না কারো কাছের মানুষ।

এই কথাগুলো এজন্যেই বলছি কারণ- ট্রল তৈরির সময় অনেক সাধারণ মানুষের ছবিই আজকাল ব্যবহার করে মজা নেয়া হয়। হয়তো মানুষটা একটু মোটা কিংবা কালো, হয়তোবা একটু বেশিই চিকন। তার প্রোফাইল থেকে একটা ছবি নিয়ে পাবলিকলি সেটা নিয়ে তাকে ব্যঙ্গ করলেন। আর এই বিষয়টা সেই মানুষটার চোখে পড়লে তার ভেতর যে মানসিক অত্যাচার শুরু হয়, তা কি আপনাদের বিবেকবোধে বাধে না? অন্যের দুর্বলতাকে ব্যবহার করে এরূপ কুরুচিপূর্ণ কাজ করার অনুমতি আপনাকে কে দিয়েছে!

এই ব্যাপারটি দিন দিন এতটাই মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়েছে যে, মন্ত্রী, মিডিয়ার লোক কেউই এর বহির্ভূত নয়! সাধারণ মানুষের কথা তো পূর্বেই বললাম। আমি ট্রল ব্যাপারটাকে খারাপ বলছি না, কিন্তু সেটা দ্বারা কোনো মানুষের ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে নিয়ে যখন পাবলিকলি মজা নেয়া হয়, তখন তা রীতিমতো একটা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। আর মাঝেমধ্যে এটি এতটাই মাত্রাতিরিক্ত হয়ে ওঠে, এর ফলে কোনো সাধারণ মানুষ যদি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যান, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ আবেগজনিত বিষয় অত্যন্ত জটিল। কিন্তু তখন সেই দায়ভার কে নিবে?

এখনকার অধিকাংশ মানুষরা এতটাই অত্যাধুনিক যে, একজন মানুষকে গড়ে তোলার চেয়ে তার দুর্বলতাকে ব্যবহার করে প্রতি পদে তাকে হেয় করতে বেশি জানে। এর ফলে আদতেই সেই সকল মানুষদের কীরূপ উদ্দেশ্য সাধিত হয় আমার জানা নেই। তবে এতটুকুই বুঝি, এর দ্বারা শুধু তাদের নোংরা মানসিকতারই পরিচয় প্রকাশ পায়। নিজেকে "কুল" প্রমাণ করতে যেয়ে বাংলা ভাষার বিকৃত উচ্চারণ, শিক্ষিত হয়েও অশিক্ষিতের মতো অমার্জিত ব্যবহার, প্রকাশ্যে বিভিন্ন অশ্লীল কার্যকলাপ, আইন-শৃঙ্খলা না মেনে নিজের ক্ষমতা দেখানোর অনৈতিক চেষ্টা ইত্যাদি সকল কিছুই কি আধুনিকতা? নাকি এগুলো আধুনিকতাকে ছাপিয়ে অত্যাধুনিকতার পথে চলার অপচেষ্টা?

এর দ্বারাই যদি এ সমাজ, রাষ্ট্র পরিচালিত হয়ে উন্নত হতে চায়, তবে সেগুলো কি আদতেই আমাদের ভবিষ্যতের জন্যে মঙ্গলজনক? নাকি এই অত্যাধুনিকতা দ্বারা প্রতি পদেই ধর্ষিত হচ্ছে আমাদের সমাজব্যবস্থা! হারাচ্ছি আমাদের সভ্যতা, বাঙালিদের সম্মানজনক সেই ঐতিহ্য, সংস্কৃতির পরিচয়?
লেখক : শিক্ষার্থী।
এমটিনিউজ২৪.কম/এইচএস/কেএস

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে