এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : চট্টগ্রামে গৃহস্থালি রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এখন সাধারণ মানুষের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামে ডিসেম্বর মাসে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা।
সপ্তাহের ব্যবধানে সেই একই সিলিন্ডার কিনতে গুনতে হয়েছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত। কোথাও আবার চাইলেই সিলিন্ডার মিলছে না। শীতের মৌসুমে রান্নার চাপ বাড়লেও সরবরাহ সংকট ও লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে চট্টগ্রাম নগরীর মানুষ।
বাকলিয়া, পাহাড়তলী, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, হালিশহর, মুরাদপুর, কর্ণফুলী ও বায়েজিদসহ বিভিন্ন এলাকার বাজার ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে। বহু দোকানে এলপিজি নেই, আবার যেসব দোকানে পাওয়া যাচ্ছে সেখানে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দাবি করা হচ্ছে। বিকল্প জ্বালানির সুযোগ না থাকায় সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার কিনছেন।
বাকলিয়া রাহাত্তারপুল এলাকার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম জানান, সকালে রান্নার গ্যাস শেষ হয়ে গেলে একাধিক দোকানে খোঁজ করেও সিলিন্ডার পাননি। পরে একটি দোকানে সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও দাম দিতে হয়েছে প্রায় দেড় হাজার টাকা।
এমন হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি একেবারেই অপ্রত্যাশিত। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান বউবাজার এলাকার গৃহিণী ফারজানা আক্তার। তিনি বলেন, কয়েকটি দোকানে ঘুরেও এলপিজি পাওয়া যায়নি। পরে একটি দোকানে ১২ কেজির সিলিন্ডার মিললেও দাম চাওয়া হয় ১ হাজার ৮০০ টাকা। নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় ৫০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে বাধ্য হন তিনি।
চট্টগ্রামে গৃহস্থালিতে রান্নার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার। বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাস সংকটের কারণে নগরের বহু পরিবার এখন পুরোপুরি এলপিজিনির্ভর। অনেক আবাসিক এলাকায় লাইনের গ্যাস নেই। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি বড় অংশ শহরের নিম্নমানের ভাড়াবাসে বসবাস করে, যেখানে লাইনের গ্যাস সুবিধা নেই। ফলে চাকরিজীবী পরিবারগুলোকে প্রতিদিন বাড়তি খরচের চাপ নিয়ে চলতে হচ্ছে। টানা দুই সপ্তাহ ধরে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে সেই চাপ এখন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তাদের চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সরবরাহ পাচ্ছেন না। একাধিক দোকানির দাবি, এক হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা দিলে ২০০ থেকে ৩০০টির বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। এতে দোকান পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অনেক সময় ডিপোতে গিয়ে ট্রাক নিয়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে, বেড়েছে পরিবহন খরচও। সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপানো হচ্ছে।
এলপিজি পরিবেশক ও বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে অধিকাংশ কোম্পানি পর্যাপ্ত সরবরাহ দিতে পারছে না। হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি নিয়মিত এলপিজি দিচ্ছে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে এবং এই সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। কোম্পানি পর্যায়েই প্রতি সিলিন্ডারে ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা খুচরা পর্যায়ে গিয়ে কয়েকশ টাকায় পৌঁছাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের পেছনে শুধু স্থানীয় অনিয়ম নয়, আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও বড় কারণ। শীতের মৌসুমে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানির চাহিদা বাড়ায় বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এলপিজি আমদানির জাহাজসংকট। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে অন্তত ২৯টি এলপিজিবাহী জাহাজ চলাচলের বাইরে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। যেখানে দেশে প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়, সেখানে ডিসেম্বরে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০ হাজার টনে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারদরের ভিত্তিতে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে। ডিসেম্বর মাসে প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১০৪ টাকা ৪১ পয়সা, সে অনুযায়ী ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, মজুত, বোতলজাতকরণ, পরিবহন ও খুচরা কোনো পর্যায়েই নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রির সুযোগ নেই।
অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটির দাবি, সরবরাহ সংকটের অজুহাতে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি আইনত অপরাধ। তবে বাস্তবে কমিশনের নির্দেশনার প্রতিফলন বাজারে দেখা যাচ্ছে না। জেলা প্রশাসন কিংবা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিয়মিত অভিযান না থাকায় বাজার কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে।
এলপিজির লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে চট্টগ্রামের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো মারাত্মক চাপে পড়েছে। অনেক পরিবার রান্নার খরচ কমাতে খাবারের মেনু পরিবর্তন করছে। কেউ কেউ একবেলা রান্না করে দুই বেলার খাবার চালানোর চেষ্টা করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব থাকলেও দেশের ভেতরে কার্যকর নজরদারি না থাকাই বড় সমস্যা। আমদানি সংকটের সুযোগ নিয়ে যদি খুচরা পর্যায়ে ইচ্ছেমতো দাম বাড়ানো হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে।
এরই মধ্যে জানুয়ারি মাসের জন্য এলপিজির দাম আরও বাড়ানো হয়েছে। রোববার (০৪ জানুয়ারি) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন জানায়, জানুয়ারি মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হবে। একই সঙ্গে অটোগ্যাসের দামও বাড়িয়ে মূসকসহ প্রতি লিটার ৫৯ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।