রবিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ০৩:৪২:০৮

রোহিঙ্গাদের জন্য বড় আশ্রয়কেন্দ্র বানানো হচ্ছে

রোহিঙ্গাদের জন্য বড় আশ্রয়কেন্দ্র বানানো হচ্ছে

নিউজ ডেস্ক : কক্সবাজারের উখিয়ার একটি জায়গায় দুই লাখ রোহিঙ্গার জন্য আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমন পীড়নের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য সেখানে সব ধরনের ব্যবস্থা থাকবে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খালেদ মাহমুদ এ কথা জানিয়েছেন।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন উখিয়ার বালুখালীতে এই আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের কাজ আজই শুরু হয়েছে।

আর নির্মিত হলে এটিই হবে রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে বড় আশ্রয়কেন্দ্র, যার আয়তন হবে প্রায় আড়াই হাজার একর জুড়ে।

ওদিকে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উখিয়ায় যাবেন বলে জানাচ্ছেন কর্মকর্তারা।

জাতিসঙ্ঘের হিসেব অনুযায়ী এ দফায় ভয়াবহ নির্যাতনের মুখ প্রাণ বাঁচাতে কমপক্ষে দুই লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। বাংলাদেশ সবসময়ই এসব রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য আহবান জানালেন মিয়ানমার তাতে কখনোই সাড়া দেয়নি।

'বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া সব রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে আনা হবে না'
মিয়ানমারের একজন মন্ত্রী বলেছেন, যে রোহিঙ্গা মুসলিমরা বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে তাদের সবাইকে ফিরে আসতে দেয়া হবে না।

মিয়ানমারের পুনর্বাসন বিষয়ক মন্ত্রী ইন মিয়াট আয় বলেন, যে রোহিঙ্গারা প্রমাণ করতে পারবে যে তারা মিয়ানমারে বাস করতো এবং মিয়ানমারের নাগরিক - শুধু তারাই ফিরে যেতে পারবে।

বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন, এর ফলে মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারবে এমন রোহিঙ্গার সংখ্যা হবে খুবই সীমিত কারণ বেশিরভাগ রোহিঙ্গাকেই নাগরিকত্ব দেয়া হয়নি।

গত দু সপ্তাহে রাখাইন প্রদেশে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর প্রায় তিন লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলিম সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

অন্যদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টান্যাশনাল বলছে, তাদের কাছে এমন প্রমাণ আছে যে মিয়ানমার - বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর ভূমি-মাইন পেতে রেখেছে।

এর আগে সপ্তাহে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষও এমন দাবি করেছিল। বলা হয়েছিল যে মিয়ানমার থেকে পলায়নরত রোহিঙ্গা মুসলিমরা যাতে আবার সেদেশে ফিরে যেতে না পারে - সে জন্যই সীমান্তে মাইন বসানো হয়েছে।

অ্যামনেস্টি বলছে, তারা প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং তাদের নিজস্ব অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এ দাবি করছে। মাইন বিস্ফোরণে এ পর্যন্ত একজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন, বলছে অ্যামনেস্টি।

রোহিঙ্গাদের দুঃসাহসিক অভিযাত্রা
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা সেনাবাহিনী, পুলিশ ও উগ্র বৌদ্ধদের ভয়াবহ বর্বরতার চিত্র গণমাধ্যমে তুলে ধরছেন। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা, কুপিয়ে হত্যা, নারীদের নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন তারা।

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা মুসলমানরা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের পেলেই নির্মমভাবে হত্যা করছে। খুনের পর গুম করা হচ্ছে লাশ। আবার কখনও সেই লাশ নিয়ে উল্লাস করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা। বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। শিশুদেরও পুড়িয়ে মারছে।

কখনও কখনও মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে শিশুদের। বাবা-মায়ের সামনে ছেলেকে, স্ত্রীর সামনে স্বামীকে, সন্তানের সামনে বাবাকে কখনও গুলি করে, আবার কখনও গলা কেটে হত্যা করা হচ্ছে। যারা জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চাইছে তাদেরও রেহাই নেই। খুঁজে পেলেই হত্যা করা হচ্ছে। নৌকা দিয়ে পাড়ি দেয়ার সময়ও হত্যা করা হচ্ছে অনেককেই।

প্রাণ বাঁচাতে স্রোতের বেগে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা কয়েকশ’ তরুণ-যুবক-মধ্যবয়সী কাঁধে অথবা পিঠে করে বয়ে নিয়ে এসেছেন অক্ষম বৃদ্ধ বাবা-মাকে। বর্ষার এই প্রতিকূল পরিবেশও তাদের পথে বাধা হতে পারেনি। নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের জীবন বাঁচাতে যেন তারা দুঃসাহসিক অভিযানে নেমেছেন। তাদের সহযাত্রী হয়েছেন নারী ও শিশুরাও। যখন তারা আর এগোতে পারছেন না জিরিয়ে নিচ্ছেন। বাংলাদেশের ভেতরে ঢোকার পর তাদের ভয় অনেকটাই কমে গেছে। এ কারণে তারা বিশ্রাম নিয়ে আস্তে আস্তে এগোচ্ছেন। অনেকেই আবার কাদার মধ্যেই বিশ্রাম নিয়ে পা বাড়াচ্ছেন।

জাতিসঙ্ঘ শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা শুক্রবার জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় দুই লাখ ৭০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমারের রাখাইন স্টেট থেকে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন।

নাফ নদীর ওপারে এখনও হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন। তারা যেন বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ করতে পারলেই বেঁচে যান। বন, জঙ্গল, পাহাড় আর নদী পেরিয়ে যারা বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন তারা নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন। তাদের গন্তব্য এখন টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প। যদিও সেখানেও নেমে এসেছে মানবিক বিপর্যয়।

গত ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও পুলিশের হত্যাযজ্ঞের মুখে তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা ইতোমধ্যে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। অব্যাহত রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া। সীমান্তের এপার থেকে প্রতিদিনই রোহিঙ্গাদের ঘববাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। অভিযানে হেলিকপ্টার গানশিপেরও ব্যাপক ব্যবহার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা যাতে ফিরতে না পারে সেজন্য সীমান্তে পুঁতে রাখায় হয়েছে স্থলমাইন। মাইন বিস্ফোরণে ইতোমধ্যে কয়েকজন আহতও হয়েছেন।

এ দফায় রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা তিন লাখ ছাড়াতে পারে
বাংলাদেশের ভেতর মিয়ানমার থেকে পালানো রোহিঙ্গাদের ঢল অব্যাহত রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো ধারণা করছে, শরণার্থীর সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এদের আশ্রয় বা খাবার জোগাড়ে প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে।

এই রোহিঙ্গাদের বড় অংশই রাস্তার ধারে বা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের সরকার নতুন আসা এই রোহিঙ্গাদের তালিকা নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে তারা দেশের অন্যত্র ছড়িয়ে না পড়ে।

রোহিঙ্গাদের এই স্রোত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তবে সীমান্ত পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গাদের আসার ধারা পর্যালোচনা করে জাতিসংঘ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং রেড ক্রসসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আশংকা প্রকাশ করেছে যে, এই দফায় শরণার্থীর সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ঢাকায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির মুখপাত্র দিপায়ন ভট্টচার্য বলেছেন, "আপনি যদি গত বছর মিয়ানমারের নাগরিকদের বাংলাদেশে ঢোকার প্রবণতা দেখেন, তাহলে লক্ষ্য করবেন, তখন অক্টোবর এবং নভেম্বর মিলিয়ে দুই মাসে ৭৫ হাজার বাংলাদেশে এসেছিল। এবার দশ থেকে এগার দিনের মধ্যেই এক লাখ ষাট হাজার বাংলাদেশে এসেছে। এবং আরও ৫০ হাজারের মতো সীমান্তের অপর পাড়ে অপেক্ষা করছে।সেজন্য আমাদের বড় একটি সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় তিল লাখ যে সংখ্যাটি বলা হচ্ছে, তা বাস্তবসম্মত।"

হাজার হাজার রোহিঙ্গার আশ্রয় এবং খাদ্য সাহায্যের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।

কুতুপালং এবং নোয়াপাড়ায় শরণার্থী শিবিরগুলোতে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের একটা অংশকে নেয়া হয়েছে। কিন্তু মানুষের গাদাগাদি অবস্থায় শিবিরগুলোতেও আর জায়গা নেই।

কুতুপালং শরণার্থী শিবির এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুরুল আফসার চৌধুরী বলছিলেন, কুতুপালং এবং বালুখালী শিবিরের বাইরে খোলা জায়গা রাস্তাঘাট সবজায়গায় শুধু মানুষ আর মানুষ। তাদের একটা নিয়ম বা পদ্ধতির মাধ্যমে খাদ্য বা মানবিক সাহায্য দেয়ার ব্যবস্থা এখনও হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

"পথে-ঘাটে, স্কুল মাদ্রাসা বা পরিত্যক্ত জায়গায় রোহিঙ্গারা যে যেভাবে পারে আশ্রয় নিয়েছে। এমন অবস্থা হয়েছে যে, রাস্তা-ঘাটসহ সর্বত্র শুধু রোহিঙ্গা আর রোহিঙ্গা। তাদের খাবারের বেশ কষ্ট হচ্ছে। নিয়মিত খাবার কেউ দিচ্ছে না। স্থানীয় লোকজন অনেক সময় খাবার এনে দিলে তারা সেটা খাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের অনেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়ি ঘরে ঘিয়ে খাবার চেয়ে নিচ্ছে।"

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, এবার আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা তাদের সব ধারণাকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে আশ্রয় বা খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থাপনায় কিছুটা ঘাটতি হয়েছে বলে কর্মকর্তারা স্বীকার করেন তাদের এক জায়গায় নেয়ার কথাও সরকার বলছে।

কিন্তু সেই জায়গা নির্বাচনের প্রক্রিয়াই এখনও শেষ হয়নি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: শাহ কামাল বলেছেন, কুতুপালং এবং বালুখালি শিবিরের পাশে দুটি জায়গা জরিপ করা হয়েছে।দু'একদিনের মধ্যে তারা জায়গটি চূড়ান্ত করবেন।

রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গ্রামে বা লোকালয়েও আশ্রয় নিচ্ছেন। এবং তাতে নিরাপত্তা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলছেন।

সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের তালিকা তৈরির কথা বলা হয়েছে। তবে সেই কাজ এখনও শুরু করা যায়নি। স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গারা এসেছে। ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে তালিকা করা বা অন্য বিষয়গুলোতে ঘাটতি হয়েছে।

তবে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ড: ইকবাল হোসেন বলেছেন, "বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের এক জায়গায় নিয়ে আগামী সপ্তাহে এই নিবন্ধনের কাজ শুরুর চেষ্টা আমরা করছি।"

এদিকে তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোয়ান এবং দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রী আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সফরে এসে কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন।

তারা সেখানে মিয়ানমার থেকে এবার আসা রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলেছেন এবং ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেছেন।

বিকেলে তারা ঢাকায় এসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব বিবিসিকে জানিয়েছেন, তুরস্ক রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে তুলে ধরবে।

এছাড়া এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ কোনো পদক্ষেপ নিলে, তুরস্ক তাতে সমর্থন দেবে - তুরস্কের ফার্স্টলেডি এমন আশ্বাস দিয়েছেন।
এমটিনিউজ২৪.কম/টিটি/পিএস

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে