নূরুল ইসলাম খান, কেশবপুর (যশোর) : ‘বর্ষাকালে পানি ভেঙে, পায়ে হেঁটে তিন কিলোমিটার দূরে স্কুলে যেতাম। শত কষ্টের মধ্যেও স্কুলে যাওয়া বন্ধ করিনি।
কিন্তু আমার এসএসসির ফলে গ্রামবাসী আনন্দিত হলেও মা-বাবার মনে আনন্দ নেই। কারণ আমার ভ্যানচালক বাবার পক্ষে আমাকে ভালো কলেজে পড়ানোর সামর্থ্য নেই।’
কথাগুলো এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়া এক শিক্ষার্থী তানিয়া নাসরিনের। চলতি বছর যশোরের কেশবপুর উপজেলার গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল সে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হতদরিদ্র পরিবারটিতে অভাব-অনটন নিত্যদিনের সঙ্গী। ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান তানিয়ার বাবা। কিন্তু অভাবকে জয় করে তানিয়া বিজ্ঞান বিভাগে যশোর শিক্ষা বোর্ড থেকে জিপিএ ৫ পেয়েছে। তার এমন সাফল্যেও ভবিষ্যতে মেয়ের লেখাপড় কিভাবে চলবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বাবা আবুল হোসেন ও মা ফরিদা বেগম।
এসএসসি পরীক্ষায় তানিয়ার সাফল্যের খবর পেয়ে শনিবার উপজেলার ব্যাসডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে জানা যায়, গ্রামটি বছরের প্রায় ছয় মাস জলাবদ্ধ হয়ে থাকে। সেখানকার অধিকাংশ বাসিন্দাকে বর্ষার সময় পানি ডিঙ্গিয়ে যাতায়াত করতে হয়।
তানিয়া জানায়, এইচএসসি পাসের পর তার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন। তার ভাষ্য, ‘আমার এসএসসির ফলে গ্রামবাসী আনন্দিত হলেও মা-বাবার মনে আনন্দ নেই। কারণ আমার ভ্যানচালক বাবার পক্ষে আমাকে ভালো কলেজে পড়ানোর সামর্থ্য নেই। এ কারণে আমার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন অন্যের সহয়াতা ছাড়া পূরণ হওয়া সম্ভব নয়।’
গ্রামের বাসিন্দা শাহানাজ পারভীন বলেন, ‘তানিয়া এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে আমাদের জলাবদ্ধ গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে। কিন্তু তার পরিবার উচ্চ শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা করতে পারবে বলে মনে হয় না। অভাবের ভেতর মেয়েটা ভালো ফল করে এলাকায় সুনাম পেয়েছে।’
তানিয়ার মা ফরিদা বেগম বলেন, মেয়েটার মুখে ঠিকমতো খাবার দিতে পারিনি। তার পরও পড়া চালিয়ে গেছে। একটি দিনের জন্যও স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেনি। স্কুলের স্যারেরা মেয়েটাকে পড়াশোনার বিষয়ে সাহায্য করেছেন। এখন কিভাবে মেয়েকে পড়াব, তা জানি না।
তানিয়ার বাবা আবুল হোসেন বলেন, ‘মেয়ের স্বপ্ন পূরণে আমার কোনো উপায় নেই। তার মুখের দিকে তাকালে আমার মন খারাপ হয়। যদি মেয়ের ইচ্ছা পূরণ হতো, তাহলে গ্রামের হতদরিদ্র মানুষ ওর কাছ থেকে চিকিৎসা পেয়ে উপকৃত হতো।’ মেয়ের ইচ্ছা পূরণে সমাজের দানশীলদের এগিয়ে আসার অনুরোধ জানান তিনি।
গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুপ্রভাত কুমার বসু বলেন, ‘তানিয়া আমাদের প্রতিষ্ঠানের গর্ব। স্কুল থেকে সাধ্যমতো তাকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল। এ কারণে আমরাও তার উচ্চশিক্ষা নিয়ে চিন্তিত। সমাজের দানশীল ও বিত্তবানরা এগিয়ে এলে এই অদম্য মেধাবী একদিন ডাক্তার হয়ে মানুষের স্বাস্থ্য সেবায় এগিয়ে আসতে পারবে।’-কালের কণ্ঠ