মঙ্গলবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৩, ১২:৩৭:১১

ছিলেন মসজিদের খাদেম, এখন মাটির ভাঙা ঘরে না খেয়ে বিনা চিকিৎসায়

ছিলেন মসজিদের খাদেম, এখন মাটির ভাঙা ঘরে না খেয়ে বিনা চিকিৎসায়

এমটিনিউজ ডেস্ক: পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের চালিতাবুনিয়া গ্রামের ছত্তার ফকির (৬৬)। যুবক বয়সে বিভিন্ন মসজিদ- মাদরাসায় খাদেম হিসাবে কাজ করেছেন তিনি। এখন‌ বয়সের ভারে তিনি ও তার স্ত্রী অসুস্থ থাকায় কোনো কাজ করতে পারেন না। দিনের পর দিন না খেয়ে বিনা চিকিৎসায় অসুস্থতায় ভুগছেন তারা।

স্ত্রী আনোয়ার বেগম (৫০) ও ৩ সন্তান নিয়ে ছত্তার ফকিরের ৫ জনের সংসার ছিল। তবে ২টি সন্তান মারা যায় ছোট থাকতেই। বেঁচে থাকে সবার ছোট রুবেল (২৯)। তার এই একমাত্র ছেলে রুবেল ৫ মাস হলো বাড়ি থেকে চলে গেছে। কোথায় আছে কেমন আছে জানে না বাবা-মা। 
 
সরজমিনে খোঁজখবর নিয়ে দেখা যায়, ছোট মাটির ঘরে ভাঙা চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে, আর বিদ্যুৎবিহীন অন্ধকার ঘরের বিছানার এক কোনায় বসে ছত্তার ফকির মনের কষ্টে একটি খাবার প্লেটে তরকারি বিহীন সাদা ভাত, পোড়া মরিচ দিয়ে মাখছেন। ইচ্ছা না থাকলেও জোড় করেই ভাত মুখে দিচ্ছেন তিনি। পুরানো মাটির ভাঙা ঘরে এভাবেই চলছে বৃদ্ধ দম্পতির বসবাস। 

প্রধানমন্ত্রীর পটুয়াখালী সদর উপজেলায় ১২শ ৫২টি মুজিব বর্ষের ঘর পেলেও, তাদের ভাগে জোটেনি একটিও। আর স্ত্রী আনোয়ারা বেগম প্রতিবেশীদের বাড়িতে বাড়িতে ভিক্ষা করে স্বামীর জন্য দু মুঠো ভাত চেয়ে যেদিন আনতে পারেন দুজনে মিলে খান। আর যেদিন ভাত সংগ্রহ করতে না পারেন সেদিন না খেয়ে থাকেন বলে জানান, ব্র্যাক এনজিও থেকে ছোট একটি বাছুর গরু পেলেও তা বড় করতে আলেয়া বেগমের অনেক কষ্ট করতে হয়। এখন পর্যন্ত সরকারের দেওয়া বয়স্ক ভাতায় নাম ওঠেনি তার। আর এভাবেই কষ্টে মানবেতর জীবনযাপন করছেন দুজন।

প্রতিবেশী মাহবুব মিয়া বলেন, আমাদের প্রতিবেশী ছত্তার ফকির সে অনেক কষ্টে আছে তার ছেলে ছিল তিনটা। দুটি ছেলেই মারা গেছে আবার যে ছেলেটা ছিল সেও কোথায় হারিয়ে গেছে জানেন না। সে অনেক অসুস্থ তার যে সেবা করবে সে রকম কোনো লোক নেই । তার স্ত্রী সেও বয়স্ক মানুষ। সে গ্রামের মানুষের বাসায় কাজ করে তখন যদি ভাত পায় তাহলে খেতে পারে অনেক সময় না খেয়ে থাকে।

প্রতিবেশী আলেয়া বেগম বলেন, আমরা বিভিন্ন সময়ে যা পারি তাকে সাহায্য সহযোগিতা করি। আমরাও তো গরিব মানুষ আমাদের পক্ষে তো বেশি সহযোগিতা করা সম্ভব না। সে অনেক অসহায় বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে দুই টাকা পাঁচ টাকা যা পায় সেটা দিয়ে ওষুধ কিনে খায়।

প্রতিবেশী সালমা বেগম বলেন, তার একটি ছেলে ছিল তাও পাগল হয়ে কোথায় চলে গেছে তা কেউ বলতে পারে না। ছত্তার ফকির স্টোক করে ২/৩ বছর ধরে বাসায় পড়ে আছে। আমরা যে সময় যেটা পারি সেটা তাকে দেই।

ছত্তার ফকিরের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম বলেন, আমরা অনেক কষ্টে আছি, কোনোরকম ভাঙাচোড়া ঘরে থাকি। আমাদের কামাই রুজি করার মানুষ নাই। একটা ছেলে ছিল সেও কোথায় চলে গেছে জানি না। আমার‌ স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে, মানুষের বাড়িতে গিয়ে চাল-ডাল চেয়ে এনে সেইগুলো খাই। যখন না পাই তখন না খেয়ে থাকি। কতবার মেম্বার চেয়ারম্যানের কাছে গেছি। কত জনরে ঘর দিছে আমাগো একটা ঘর দেয় নাই।

কান্না জড়িত কণ্ঠে ছত্তার ফকির বলেন, এই ২ বছর ধরে আমি স্টোক করে অসুস্থ অবস্থায় ঘরে আছি, কামাই রুজি নাই। একটা ছেলে ছিল সেও রাগ করে ৫ মাস আগে কোথায় চলে গেছে জানি না। এখন আমার কষ্টের কোনো শেষ নেই। কোনো জায়গা থেকে আমার‌ স্ত্রী চাল পাইলে লবণ দিয়ে খাই, না পেলে না খেয়ে থাকি। তরকারি কিনতে পারি না, এর মধ্যে আমার হার্টের সমস্যা হয়েছে পানি জমে একমাস পর পর সেই পানি সরাতে ডাক্তারের কাছে যেতে হয়।

মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য খালেক বলেন, আমার এলাকায় সবচেয়ে অসহায় গরিব পরিবার হচ্ছে এই সত্তার ফকির। তার ছেলে সন্তান নেই খুবই কষ্টে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আমি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছি এর আগে যারা ছিল তারা তাকে কোনো সুযোগ-সুবিধা দেয়নি। ইতোমধ্যে আমি বয়স্ক ভাতার জন্য অনলাইনে তার হয়ে আবেদন করেছি।

মুজিব বর্ষের ঘর কেন পায়নি এই প্রশ্ন করলে তিনি জানান, আগের চেয়ারম্যান এবং মেম্বার তারা কেন তাকে ঘর দেয়নি সেটা আমি বলতে পারি না। তবে আমার ওয়ার্ডের মধ্যে সে সবার আগে ঘর পাওয়ার যোগ্য।

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে