আন্তর্জাতিক ডেস্ক : কেন কোভিড নাইনটিন ভ্যাকসিন এতো কম সময়ে তৈরি হলো? কারণ এর পেছনে অনেক অর্থ যেমন ব্যয় করা হয়েছে তেমনি ভ্যাকসিন সংশ্লিষ্ট কাজে সময় কমিয়ে আনতে বহু কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। সাধারণত কোন ভাইরাস সংক্রমণের কার্যকরী ভ্যাকসিন প্রস্তুত এবং বাজারজাত করতে এক দশকের মতো সময় লাগে।
কিন্তু সেখানে করোনার ভ্যাক্সিন তৈরি হয়েছে এক বছরেরও কম সময়ে। অন্যান্য ওষুধের মতোই কোন ভ্যাকসিন অনুমোদন আর কোন দেশের জনগণের ওপর প্রয়োগের আগে কঠোরভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়। মানুষে প্রয়োগের আগে এই ভ্যাকসিন ল্যাবরেটরির প্রাণিদেহে প্রয়োগ করা হয়, নিরাপদ কিনা সেটা দেখার জন্য। কোভিড নাইনটিন ভ্যাকসিন প্রথমে ইঁদুর আর বানরের ওপর প্রয়োগ করা হয়।
কারণ তাদের দৈহিক আর জৈবিক গঠনে মানুষের সাথে মিল আছে। ভ্যাকসিন যদি প্রাণিদেহে নিরাপদে কাজ করে আর কার্যকর প্রমাণিত হয়, তবেই সেটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়। প্রথম ধাপে ২০ থেকে ৫০ জন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী স্বেচ্ছাসেবীর ওপর প্রয়োগ করা হয় ভ্যাকসিন। ভ্যাকসিনটি নিরাপদ কিনা, কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা, সেটি দেখার পাশাপাশি ভ্যাকসিনটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটুকু শক্তিশালী করছে, সে বিষয়ে নিরীক্ষা চালানো হয়।
নির্ধারণ করা হয় কতোটুকু পরিমাণ ভ্যাকসিন কোন বয়সী মানুষের শরীরে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। দ্বিতীয় ধাপে কয়েকশ' স্বেচ্ছাসেবীর শরীরে ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করা হয়। নিরীক্ষা করা হয়, মানুষের শরীরে কতোটুকু কার্যকরী ভূমিকা রাখছে এটি। এ গ্রুপে সব বয়সী নারী পুরুষের শরীরে প্রয়োগ করা হয়। তৃতীয় ধাপে কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবীর শরীরে প্রয়োগ করা হয় ভ্যাকসিনটি।
এক্ষেত্রেও নিরীক্ষা করা হয় মানুষের শরীরে ভ্যাকসিনটি কতোটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখছে, তবে তা বেশ বড় পরিসরে। এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো একটার পর একটা চলতে থাকে। সাথে সাথে তথ্য প্রস্তুত হতে থাকে ভ্যাকসিনটি কতোটুকু নিরাপদ আর কার্যকরী। সফলভাবে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পরই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, পরবর্তী ট্রায়ালে যাবে কিনা। কিন্তু করোনা মহামারীর ভয়াবহতার কারণে সবগুলো ধাপ নিখুঁতভাবে অনুসরণ করা সম্ভব হয়নি।
সবগুলো পদক্ষেপই নেয়া হয়েছে তবে সংক্ষিপ্ত আকারে। দেশগুলো অনেক বেশি উদ্বিগ্ন যেকোনো একটা সমাধানের জন্য। বিভিন্ন সংস্থায় যাচ্ছে অর্থ। নিয়োগ দেয়া হচ্ছে বিজ্ঞানী, সময়ের সাথে প্রতিযোগিতা করে যারা কাজ করে যাচ্ছেন। কর্মী নিয়োগ দিচ্ছেন, যেন তারা দ্রুত আরো বেশি স্বেচ্ছাসেবী খুঁজে বের করতে পারেন। করোনা মহামারী এতো দ্রুত ছড়িয়েছে যে, ভ্যাকসিন ট্রায়ালের চেয়ে স্বেচ্ছাসেবীদের প্রয়োগই সংস্থাগুলোর কাছে বেশি সহজ মনে হয়েছে।
ভ্যাকসিনের পক্ষে যখন পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে গেছে, তখনই সেসব তথ্য একটি দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছে দেয়া হয়েছে অনুমোদনের জন্য। বিজ্ঞানী আর ডাক্তাররা নিরীক্ষা করেছে ভ্যাকসিনটি কতোটুকু মানসম্মত, নিরাপদ ও কার্যকরী। সাথে ভ্যাকসিন কীভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, নিরাপত্তা মানদণ্ড মানা হয়েছে কিনা, মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে কিনা সবই নিরীক্ষা করা হয়েছে।
সব ট্রায়াল শেষের পরই এই ধাপগুলো আসে। কিন্তু কোভিড নাইনটিন সংক্রমণে ব্যতিক্রম হয়েছে। কিন্তু ব্রিটেনে ট্রায়ালের সাথে সাথেই তথ্যগুলো পর্যালোচনার কাজও চলেছে। এরপর যদি কোন ভ্যাকসিন অনুমোদন পায়, তবে সেটি বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর প্রয়োগ করা যেতে পারে। পাশাপাশি নীতিনির্ধারকরা সেই জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসহ সব তথ্য নিরীক্ষা করতে থাকে। এটা যেকোনো ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেই করা হয়। যেকোনো ভ্যাকসিনই কোথাও পাঠানোর আগে মানদণ্ড নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হয়। সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স ও দ্যা গার্ডিয়ান।