জামির হোসেন : ছিলেন জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা। সেখান থেকে হঠাৎ করেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। ক্ষমতায় আসার পর গত দুই বছরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ইস্যুতে খবরের শিরোনাম হয়েছেন ভলোদিমির জেলেনস্কি।
কিন্তু গত সপ্তাহে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধের ডাক দিয়ে ধর্মবর্ণনির্বিশেষে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের প্রশংসা কুড়াচ্ছেন তিনি। কিন্তু এসব ছাপিয়েও তাকে আরও একটু ব্যাতিক্রম দৃষ্টিতে দেখছে ইহুদিরা। রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ায় তাকে এ যুগের ‘ইহুদি বীর যোদ্ধা’ আখ্যা দিচ্ছে ইসরাইলের জনগণ।
গত সপ্তাহে (২৪ ফেব্রুয়ারি) রুশ বাহিনীকে ইউক্রেনে হামলার নির্দেশ দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এরপর রুশ সেনাবহর চারদিক থেকে রাজধানী কিয়েভ ঘিরে ফেললেও প্রাণভয়ে দেশ ছাড়েননি জেলেনস্কি।
পুতিন বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য হওয়া সত্ত্বেও না পালিয়ে প্রতিরোধযুদ্ধের ঘোষণা দেন তিনি। শুধু তাই নয়, অসীম সাহসিকতার সঙ্গে এই যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। জেলেনস্কির এই সাহস ও নেতৃত্বের প্রশংসায় পঞ্চমুখ গোটা বিশ্ব।
ইউক্রেনে চলমান রাশিয়ার অভিযানকে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হিসাবে দেখছে বিশ্বের ইহুদিরা। যেমনটা খ্যাতনামা বামপন্থি ইহুদি লেখক ও চিত্রশিল্পী মলি ক্রাবাপলের কথায়ও উঠে এসেছে। রুশ হামলার পর রাজধানী কিয়েভ থেকে ইউক্রেনের জনগণের উদ্দেশে দেওয়া জেলেনস্কির এক বক্তব্যের পর এক টুইটবার্তায় মলি বলেন, ‘এই মুহূর্তে একজন ইহুদি হিসাবে জেলেনস্কির সাহস, আত্মমর্যাদা ও তেজস্বিতায় গর্ব অনুভব না করে উপায় নেই।’ খ্যাতনামা ইহুদি লেখক পিটার ফক্স বলেছেন, ‘জেলেনস্কি আধুনিক যুগের ম্যাকাবি।’ পিটার ম্যাকাবি বলতে প্রাচীন এক ইহুদি বীর নেতাকে বুঝিয়েছেন যিনি শক্তি ও সামর্থ্যে পিছিয়ে থেকেও ক্ষমতালিপ্সু এক বিদেশি শাসকের হানাদার যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
জেলেনস্কি একজন ইহুদি। তার দাদারা ছিলেন চার ভাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়ার রেড আর্মির পক্ষে জার্মানির হিটলারের নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে বাবার সঙ্গে লড়াইয়ে যান তারা। ইহুদিবিরোধী ওই যুদ্ধে (হলোকাস্ট, ইহুদি নিধনযজ্ঞ) বাবা ও তিন ভাইকে হারিয়ে একাই বেঁচে ছিলেন জেলেনস্কির দাদা স্যামওয়োন ইভানোভিচ জেলেনস্কি। পরিচিতরা বলেন, দাদা স্যামওয়োনই জেলেনস্কির জীবনপথের আদর্শ। ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেওয়ার পর পরই ছুটে যান পৈতৃক বাড়ি ক্রিভি রিহতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর কাছে নাৎসি জার্মানির আত্মসমর্পণের দিনকে স্মরণ করে উদ্যাপিত ভিক্টরি ডেতে (৯ মে) দাদার কবরে শ্রদ্ধা জানান। হলোকাস্ট দিবস উদ্যাপনে ১৯২১ সালে ইসরাইল সফরেও যান প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি।
তার বেশির ভাগ আত্মীয়স্বজনই থাকেন ইসরাইলে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর ইউক্রেন ছেড়ে চলে যান তারা। হয়তো এসব যোগসূত্রেই রুশ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে জিলেনস্কির সবচেয়ে বেশি সমর্থন দেখা যাচ্ছে ইসরাইলে। কয়েকদিন ধরেই নিয়ম করে দেশটির রাজধানী তেল আবিবে প্রতিবাদ বিক্ষোভ হচ্ছে। বিক্ষোভে ‘জিলেনস্কি, জিলেনস্কি’ বলে স্লোগান উঠছে।
জিলেনস্কির জয়ের জন্য প্রার্থনারও আয়োজন করা হচ্ছে। চলতি সপ্তাহে প্রার্থনার আহ্বান জানিয়ে এক ইসরাইলি নাগরিকের টুইটারে শেয়ার করা একটি পোস্ট লাখ লাখবার শেয়ার হয়েছে। জেলেনস্কির প্রশংসায় মেতেছে ইহুদি সংবাদমাধ্যম ও ওয়েবসাইটগুলোও। চলতি সপ্তাহে ‘গুড’ নামে একটি সংবাদমাধ্যম একটি টুইট বার্তা শেয়ার করে। যাতে লেখা ‘এই হলেন ভলোদিমির জেলেনস্কি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। তিনি একজন ইহুদি। তার দাদা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তার অনেক আত্মীয়স্বজনই হলোকস্টের সময় নিহত হয়েছেন। একজন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
কারণ তিনি একজন সাহসী বীর।’ চলমান রুশ হামলার মধ্যে নিজের ইহুদি পরিচয় সামনে এনে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন জেলেনস্কি নিজেও। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জেলেনস্কি দাবি করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর হাতে নিহত ইহুদিদের সম্মানে রাজধানী কিয়েভে নির্মিত বেবিন ইয়ার নামে একটি স্মৃতিসৌধ রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সৌধটি ধুলোয় মিশে গেছে দাবি করে টুইটারে তিনি লেখেন, ‘আমি বিশ্বের সব ইহুদির উদ্দেশে বলছি, এখানে কী ঘটছে আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন না?’ সূত্র: যুগান্তর