আন্তর্জাতিক ডেস্ক : রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর সর্বত্রই বইছে নীরবতার সুর। মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। শপিং সেন্টারে লোক সমাগম আগের চাইতে অনেক কম দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক দিন রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা বিশ্বের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অথবা ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে মস্কোতে তেমন একটা প্রভাব লক্ষ্য করা যায়নি। জীবন গতি স্বাভাবিকই চলছিল।
মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তেমন লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু বিশ্বের ব্যাংক লেনদেন ব্যবস্থা সুইফট থেকে একের পর এক রুশ ব্যাংককে বহিষ্কার করা শুরু হলে মস্কোবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। কেবল অর্থনৈতিকভাবেই রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি। সামাজিক, সাংস্কৃতিক নানাভাবেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। একের পর এক এই নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সারা পৃথিবী এক হয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাশিয়াকে উত্তর কোরিয়ার মতো পৃথিবী থেকে যেন বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে, একঘরে করে ফেলা হয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পরে মস্কো এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে একঘরে বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন। নানা রকম নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত রাশিয়া। এখন দেখার বিষয় এই নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার জীবনে কী প্রভাব পড়ছে বা পড়তে পারে এবং এটা তারা কিভাবে মোকাবিলা করবে।
শুরুতে বলে নেওয়া ভালো যে এই নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার জন্য নতুন কিছু নয়। তবে এবারের নিষেধাজ্ঞা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন। এবার ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে ব্যাংক, প্রতিষ্ঠান অনেক কিছুই নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে। বলা যায়, পুরো রাশিয়াকে পৃথিবী থেকে একঘরে করে ফেলা হয়েছে। রাশিয়ান জনজীবনে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে। হয়তো এর প্রভাব আরো সুদূর প্রসারি হতে পারে।
গত সপ্তাহে নিষেধাজ্ঞা আরোপের শুরুর দিকে মস্কোর সাধারণ মানুষ মনে করেছিল তাদের গচ্ছিত অর্থ ব্যাংক থেকে নাই হয়ে যাবে এবং একটি গুজব রটেছিল যে ব্যাংক একাউন্ট হ্যাক করে সেই অর্থ ইউক্রেনীয়দের সাহায্যের জন্য পাঠানো হবে। তাই সকলের মধ্যে ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক পড়ে যায়। বেশ কয়েকদিন ধরে রাশিয়ার এটিএম বুথগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছিল। লোকজন ইলেকট্রনিক ব্যাংকিং বিপর্যয়ের আশঙ্কায় পড়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রা এবং রুবল উভয় অর্থই নগদ তোলার হিড়িক শুরু হয়। সেই আতঙ্ক এখন আর নেই।
মস্কোর শেয়ার বাজারেও পতন ঘটে। শেয়ার বাজার বেশ কয়েকদিন বন্ধ রাখা হয়। এখন আবার স্বাভাবিকভাবেই চলছে। অনেক লোক ভেবেছিল তাদের সঞ্চয় হারিয়ে গেছে। রুবলের মান রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। ডলারের দাম গত কয়েক দিনে ৭৫ থেকে ১১০ রুবল হয়েছে। রুবলের ব্যাপক পতন হয়েছে। এদিকে শোনা যাচ্ছে কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ডস ও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যদি তা সত্য হয় তবে এটি এখানকার বিদেশি অথবা নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য খুব সমস্যা তৈরি করবে। কেননা ব্যস্ত শহরের মানুষদের জন্য কেএফসি আর ম্যাকডোনাল্ডস অপরিহার্য।
এছাড়া মার্সিডিজ বেঞ্জের মতো বিখ্যাত কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা গুটিয়ে চলে যাচ্ছে যারা বছরের পর বছর ধরে রাশিয়াকে তেল, গ্যাস এবং গাড়ি উৎপাদনে সাহায্য করে আসছিল। এগুলো হয়ত রাশিয়ার ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে কিন্তু ছোট এবং তাৎক্ষনিক অনেক অসুবিধার মধ্যে একটি হলো, অ্যাপল পে এবং গুগল পে রাশিয়াতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
রুশরা ভ্রমণপ্রিয় জাতি। সারা বছর তারা কাজ করে আর গ্রীষ্মের তিন মাসের ছুটিতে পরিবার, বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সামনে গ্রীষ্ম উপলক্ষে যে ভ্রমণের পরিকল্পনা ছিল সবার তা বাতিল করতে হচ্ছে। রাশিয়ান বিমানগুলোকে আকাশপথ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর রাশিয়ার জাতীয় বিমান সংস্থা অ্যারোফ্লট আন্তর্জাতিক সব রুটে ফ্লাইট বাতিল করেছে। অনেকে অগ্রিম টিকেট করে রেখেছিলো।
অনেকে ভাবছেন, রাশিয়ান এয়ারলাইন্সের কর্মীদের আয় কোত্থেকে আসবে? যেহেতু তাদের কর্মস্থল অকেজো হয়ে পড়েছে। বোঝাই যাচ্ছে এক নতুন বাস্তবতার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে রাশিয়া। তবে এই নিষেধাজ্ঞার পরেও মস্কোবাসীর বা রাশিয়ানদের যতটা উদ্বিগ্ন হবার কথা ছিল ততটা উদ্বেগ প্রবীণদের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
এক প্রবীণ বলেন, এসব আমাদের জানা। আমেরিকানদের আক্রোশ আমাদের প্রতি নতুন কিছু নয়। তবে প্রবীণ এবং নবীন প্রজন্মের মধ্যে চিন্তায় তুমুল পার্থক্য রয়েছে। অন্য বিশ্বে কী হচ্ছে সে বিষয় নিয়ে প্রাচীনপন্থীদের তেমন মাথা ব্যথা নেই। এখানকার অধিকাংশ মানুষ ইংরেজি ভাষা জানে না যার ফলে বহির্বিশ্বে কী হচ্ছে সে সম্পর্কে জানার সুযোগ তাদের কম।
আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও তাদের নিজস্ব বিধিনিষেধ আরোপ করেছে রাশিয়ার ওপর। ইতোমধ্যেই ডিজনি, ওয়ার্নার ব্রাদার্স এবং প্যারামাউন্ট রাশিয়ার চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি কান ফিল্ম ফেস্টিভাল এবং ইউরোভিশন গানের প্রতিযোগিতা উভয়ই এই বসন্তে পারফর্ম করা থেকে রাশিয়ান প্রতিনিধিদের প্রত্যাখ্যান করেছে। অনেক রাশিয়ান এই বিষয়টি তাদের জন্য খুবই লজ্জার এবং অপমান হিসেবেই ভাবছে।
রুশ ক্রীড়াবিদদের সকল আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং প্রতিযোগিতা বাতিল করা হয়েছে। শিল্পী এবং দলগুলোর সফর, সাংস্কৃতিক এবং বৈজ্ঞানিক যোগাযোগের প্রোগ্রামগুলোও বাতিল করা হয়েছে। অনেকেই মনে করে অদূর ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মিথস্ক্রিয়ার যে জায়গা তৈরি হয়েছিল, সেটি পুনরুদ্ধারের আর কোনো সুযোগ থাকবে না। আবার অনেকেই বলছেন যে, তারা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বিগ্ন নয় বরং তারা উদ্বিগ্ন ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে।
এখানে প্রাচীনপন্থীদের ধারণা ইউরোপ-আমেরিকা তাদের পূর্ব শত্রুতার জের ধরেই এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং এতে তারা বিচলিত নয় এবং তারা মনে করে এতে রুশ জাতি আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হবে এবং নিজেরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াবার পথ খুঁজে পাবে। অনেকে মনে করে, রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের এই নিষেধাজ্ঞার চাপ ব্যাপারটি বেআইনি, এটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল।
অনেকেই হতাশ। তারা মনে করেন, রাশিয়ানদের ক্রমবর্ধমান বিশ্বব্যাপী সংযুক্ত অর্থনীতি আবারো থেমে গিয়ে বিশ্ব থেকে বিচ্যুত হবে। আবার অনেকে এই হতাশা থেকে শক্তি খুঁজে পান, তারা মনে করেন এই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক জগৎ তৈরি করতে সাহায্য করবে। যা রাশিয়ান অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের মহাপরিচালক আন্দ্রে কর্চুনফ বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়তে সময় লাগবে। রাতারাতি হবে না। বেশির ভাগ নিষেধাজ্ঞা মূলত প্রতীকী। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে রাশিয়া বিশ্ব অর্থনীতিতে দিন দিন বিচ্ছিন্ন হতে থাকবে। ইরান, উত্তর কোরিয়ার মতো বিচ্ছিন্ন হতে পারে রাশিয়া। নতুন নতুন প্রযুক্তি রাশিয়া পাবে না। রাশিয়ার জনগণের জীবনযাত্রার মানেও এর প্রভাব পড়বে। এর কারণ প্রেসিডেন্ট পুতিনের বর্তমান সামরিক অভিযান।
রাশিয়ানদের মনোভাব নিয়ে আন্দ্রে কর্চুনফ বলেন, পুতিনের এই অভিযান কত দিন ধরে চলে, ক্ষয়ক্ষতি কতটা হয়, তার ওপর রাশিয়ার জনগণের প্রতিক্রিয়া নির্ভর করবে। কারণ রাশিয়ার বেশির ভাগ নাগরিক এখনো বিশ্বাস করে, এই অভিযান তুলনামূলক সহজ হবে। খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে না। তারা আরো বিশ্বাস করে, ইউক্রেনের জনগণ রাশিয়ার সেনাদের স্বাগত জানাবে। রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি খুব সীমিত আকারে হবে। তাদের এই ধারণা ও বিশ্বাসগুলো ভুল প্রমাণ হলেই রাশিয়ার জনগণের মনোভাব বদলে যাবে। সূত্র : ইন্ডিয়া টুডে