আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন বটে। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সেই নির্দেশের পিছনে কি তার একার পরিকল্পনা কাজ করেছে নাকি তাতে রয়েছে পুতিন-ঘনিষ্ঠ 'নবরত্নে'র পরামর্শ। এমনই প্রশ্ন উঠছে সংবাদমাধ্যমে। পুতিনের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের সেই নয় ব্যক্তি কারা? চলুন দেখা নেওয়া যাক কারা এই 'নবরত্ন'।
রাশিয়ান সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই ইউক্রেন অভিযানের যাবতীয় দায়ভার পড়েছে পুতিনের উপর। যুদ্ধবিরো'ধী আন্দোলনকারীরা তাকে একনায়কের তকমাও দিয়ে দিয়েছেন। তবে রাশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে সে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগুর ভূমিকাও কম নয়। সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই সলডাটভের দাবি, ''রাশিয়ার সেনাবাহিনীর দায়িত্বের পাশাপাশি যু'দ্ধাভিযানের পিছনেও শোইগুর মতামত গুরুত্বপূর্ণ।''
এককালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসাবে পুতিনের পর শোইগুকেই উপযুক্ত বলে ভাবা হত। রাশিয়ার সেনাবাহিনীর গুপ্তচর সংস্থার প্রধানের দায়িত্বে থাকা শোইগুর সঙ্গে পুতিনের ঘনিষ্ঠতার কথাও অজানা নয়। পুতিনের সঙ্গে সাইবেরিয়ার মাছ ধরতেও দেখা গিয়েছে তাকে। আমেরিকা এবং ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যমের দাবি, ২০১৪ সালে ক্রাইমিয়ার যুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল শোইগুর।
২০১২ সাল থেকে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসাবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন ভ্যালেরি জেরাসিমভ। পুতিনের সামরিক অভিযানের পিছনে তিনিই নাকি অন্যতম মগজাস্ত্র। গত মাসে বেলারুশে সামরিক মহড়ার তত্ত্বাবধানেও ছিলেন জেরাসিমভ। ক্রাইমিয়ার যুদ্ধের পিছনে অন্যতম ভূমিকা ছিল জেরাসিমভের। যদিও ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের দাবি, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যু'দ্ধ ঘোষণার পর পুতিনের সঙ্গে ডেরাসিমভের সম্পর্কে চি়ড় ধরেছে। যে গতিতে ইউক্রেনের যু'দ্ধ এগোচ্ছে, তাতে নাকি খুশি নন পুতিন।
পুতিনের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান নিকোলাই পাতরুশেভও। সত্তরের দশক থেকেই সেই সম্পর্কের সূত্রপাত। অনেকের মতে, পুতিনের নবরত্নের যে তিন জন অতি কাছের মানুষ, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন পাতরুশেভ। বাকি দু'জন হলেন, আলেকজান্ডার বর্তনিকভ এবং সের্গেই নারিশকিন। এককালে সোভিয়েত ইউনিয়নের গুপ্তচর সংস্থা কেজিবির সর্বেসর্বা ছিলেন পাতরুশেভ।
তবে সোভিয়েতের পতনের পর ১৯৯৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ফেডেরাল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি) দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সহকারী অধ্যাপক তথা রাশিয়ার রাজনৈতিক বিষয়ের বিশেষজ্ঞ বেন নোবলের মতে, ''পাতরুশেভের মতো ক্ষুরধার কমই রয়েছেন। পশ্চিমী দেশগুলি যে রাশিরার পিছনে উঠেপড়ে লেগেছে বলেই মনে করেন পাতরুশেভ।'' নিকোলাই পাতরুশেভের পর এফএসবি দায়িত্বে এসেছিলেন আলেকজান্ডার বর্তনিকভ। নিজের সুরক্ষায় বিশেষ বাহিনীও রয়েছে তার।
পুতিনের এই ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বি'রু'দ্ধে অভিযোগ, গত বছরে রাশিয়ার নাগরিক সমাজের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছেন তিনি। সরকার বিরো'ধী কণ্ঠরোধ করার জন্য যথেচ্ছ আ'টক ও ধ'রপাকড় চালিয়েছেন বলেও বর্তনিকভের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। পুতিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত বর্তনিকভ কি বকলমে যাবতীয় ক্ষমতার অধিকারী? বেন নোবলের সাবধানী জবাব, ''রাশিয়ায় কার সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে, সে বিষয়ে আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কোনও মন্তব্য করতে পারি না।''
২০১৬ সাল থেকে রাশিয়ার ফরেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের ডিরেক্টর হিসাবে দায়িত্বে রয়েছেন সের্গেই নারিশকিন। পুতিনের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকলেও সাম্প্রতিক কালে প্রকাশ্যেই তাদের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একটি ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, তাকে 'স্পষ্ট কথা' বলার জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন পুতিন। পুতিন এবং নারিশকিনের কোন বিষয়ে মতানৈক্য হয়েছিল বলে অভিযোগ?
ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলির দখলে থাকা অঞ্চলকে আলাদা রাষ্ট্রের মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্তে তার সমর্থন রয়েছে কি না, তা নিয়েই নাকি নারিশকিনের মতামত জানতে চেয়েছিলেন পুতিন। সে সময়ই নাকি ওই মন্তব্য করেন তিনি। যদিও সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই সলডাটভের দাবি, ''নিজের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা লোকজনের সঙ্গে মজা করতে ভালবাসেন পুতিন। সে কারণেই নারিশকিনকে বোকা বানাচ্ছিলেন।''
রাশিয়ার বিদেশমন্ত্রীর বসের্গেই লভরভ সে দেশের সবচেয়ে প্রবীণ কূটনীতিক বলে পরিচিত। যদিও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ৭১ বছরের লভরভই একঘরে করে রাখা হয়েছে বলে অনেকের দাবি। ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে তথকথিত মতানৈক্য থাকলেও জাতিসংঘের দরবারে তা নিয়ে গলা ফাটাতে দেখা গিয়েছে লভরভকে। সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই যুদ্ধের পক্ষে রাশিয়ার হয়ে নানা যুক্তি তুলে ধরেছেন তিনি।
নব্বইয়ের দশকে সেন্ট পিটার্সবার্গে ডেপুটি মেজর হিসাবে কর্মরত ছিলেন ইউরি কোভালচুক। সে সময় থেকেই পুতিনের সঙ্গে আলাপ তার। অনেকের কাছেই পুতিনের 'ব্যাঙ্কার' হিসাবে পরিচিত কোভালচুক। তবে ইউক্রেনের যু'দ্ধ শুরুর পর সম্প্রতি তার উপর নিষে'ধা'জ্ঞা জারি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা, কানাডা এবং সুইৎজারল্যান্ড। যদিও ক্রাইমিয়ার যু'দ্ধের সময় থেকেই আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নজরে রয়েছে কোভালচুক। ওই সময় থেকেই তার উপর নানা বিধিনিষে'ধ রয়েছে।
পুতিনের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে অন্যতম আর এক জন হলেন রাশিয়ার সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী ভ্লাদিমির মেডিনস্কি। ইউক্রেনের যুদ্ধে রাশিয়ার হয়ে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে তার নাম উঠে এসেছে। ২০১৭ সালে মেডিনস্কির বি'রু'দ্ধে প্রতার'ণার অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় নকলনবিশির অভিযোগ তার ডক্টরেট উপাধি কেড়ে নেওয়ার হু'মকি দিয়েছিল রাশিয়ার অ্যাকা়ডেমিক কাউন্সিল। অনেকের দাবি, সে সময় মেডিনস্কির রক্ষাকর্তা হিসাবে সরকারি এজেন্সিগুলি তৎপর হয়েছিল।
শেষমেশ যাবতীয় অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হয় মেডিনস্কিকে। সংবাদমাধ্যমের দাবি, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পিছনে বড়সড় হাত রয়েছে পুতিনের চিফ অব স্টাফ আন্তন ভাইনোর। ইউক্রেনে যুদ্ধ ঘোষণার পরই ভাইনোর বিরুদ্ধে নিষে'ধা'জ্ঞার কোপ দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তাদের দাবি, ''ইউক্রেনের সার্বভৌমিকতা এবং স্বাধীনতারক্ষায় ঝুঁ'কি হতে পারে এমন কার্যাবলী এবং নীতিগুলিকে সক্রিয় ভাবে সমর্থন করেছেন আন্তন ভাইনো।'' সূত্র : এবিপি