আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভ্র তুষারের চাদরে ঢাকা এক নির্জন দ্বীপ। যেখানে বছরের দীর্ঘ সময় সূর্যের দেখা মেলে না, আর হিমশীতল বাতাসে জনজীবন স্থবির হয়ে থাকে। মানচিত্রের দিকে তাকালে আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত এই গ্রিনল্যান্ডকে হয়তো কেবল বরফের স্তূপ মনে হতে পারে। কিন্তু ২০২৬ সালের ভূ-রাজনীতিতে এই দ্বীপটিই এখন বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজর এখন গ্রিনল্যান্ডের দিকেই। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে সামরিক পদক্ষেপসহ সব ধরনের বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন ট্রাম্প। এই খবরে ডেনমার্কের হুঁশিয়ারি—এমন কোনো হঠকারী পদক্ষেপ ন্যাটোর মতো শক্তিশালী জোটকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— কী আছে এই বরফরাজ্যে? কেন ডেনমার্কের এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটি দখলে নিতে এত মরিয়া ওয়াশিংটন?
বিরল খনিজের ভাণ্ডার
গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব কেবল তার আয়তনে নয়, বরং তার মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা গুপ্তধনে। এই দ্বীপে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ‘রেয়ার আর্থ মেটাল’ বা দুষ্প্রাপ্য খনিজ পদার্থের খনি। নিওডাইমিয়াম, প্রাসেওডাইমিয়াম এবং ডিসপ্রোসিয়ামের মতো এসব খনিজ ছাড়া আধুনিক স্মার্টফোন, ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি, উইন্ড টারবাইন কিংবা অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। বর্তমানে এই বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে চীন। ট্রাম্পের লক্ষ্য গ্রিনল্যান্ড কবজা করে খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের একাধিপত্য চুরমার করে দেওয়া।
রাশিয়ার দোরগোড়ায় মার্কিন নজরদারি
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে গ্রিনল্যান্ড হলো উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মেলবন্ধন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এখানে তাদের থুলে এয়ার বেস পরিচালনা করছে। রাশিয়ার উত্তর উপকূলের খুব কাছাকাছি হওয়ায় মস্কোর যেকোনো সামরিক তৎপরতা বা পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতিবিধি নজরে রাখার জন্য এটিই সবচেয়ে মোক্ষম জায়গা। আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে একটি অবিচ্ছেদ্য ‘জাতীয় নিরাপত্তা ঢাল’ হিসেবে দেখছেন।
নতুন বাণিজ্যিক নৌপথ
জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর জন্য অভিশাপ হলেও গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে তা নতুন বাণিজ্যিক পথ খুলে দিচ্ছে। আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলার ফলে উত্তর মেরু দিয়ে নতুন একটি সংক্ষিপ্ত নৌপথ তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই পথটি চালু হলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে যাতায়াতের সময় বর্তমানের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যাবে। এছাড়া বরফ সরে যাওয়ায় এর নিচে থাকা প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের পথও সুগম হচ্ছে।
এতসব গুরুত্বের কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন, যা ডেনমার্ক সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ডেনমার্ক একে ‘সার্বভৌমত্বের অবমাননা’ হিসেবে দেখলেও ট্রাম্প একে দেখছেন মার্কিন নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ হিসেবে।
গ্রিনল্যান্ডের ৫৭ হাজার আদিবাসী বাসিন্দার মতে, তাদের মাতৃভূমি কোনো বিক্রির পণ্য নয়। কিন্তু পরাশক্তিগুলোর টানাটানিতে বরফের এই শান্ত জনপদ এখন এক তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়েছে। গ্রিনল্যান্ড এখন আর কেবল মেরু ভাল্লুকের দেশ নয়; এটি আধুনিক বিশ্বের ‘নতুন স্বর্ণখনি’।