আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটিতে বড় নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দুই পরাশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে তড়িঘড়ি করে তিন সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল গঠন করেছে তেহরান। এতে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেইয়ের সঙ্গে স্থান পেয়েছেন দেশটির গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য ও প্রখ্যাত আলেম আয়াতুল্লাহ আলীরেজা আরাফি।
এই তিন জনের মধ্য থেকে একজনকে শিগগিরই একজনকে শীর্ষ নেতা নির্বাচন করা হবে বলে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন। এরপর থেকেই আলীরেজা আরাফিকে নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা ও গুঞ্জন। তিনিই কি তাহলে পরবর্তী খামেনি হবেন- এমন প্রশ্ন সচেতন মহলের মুখে মুখে।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর মূলত দেশটিতে একক নেতৃত্ব নেই। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া বা বন্ধ করার নির্দেশনা কে দেবেন- এটি নিয়েও আলোচনা আছে। এমনকি ইরানের বাহিনীগুলোর ওপরও এখন কারও নিয়ন্ত্রণ নেই, সেনাবাহিনী ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর জেনারেলরা তাদের ইচ্ছেমতো প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে রোববার (১ মার্চ) এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এমতাবস্থায় একটি বিষয় স্পষ্ট যে এক বিশাল নেতৃত্বের শূন্যতার মুখে পড়েছে ইরান। খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছে তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল। এই কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য আলীরেজা আরাফি, যিনি নিহত সর্বোচ্চ নেতার অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন।
আলিরেজা আরাফির প্রাথমিক জীবন ও উত্থান
আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি একজন অভিজ্ঞ আলেম, যিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ছিলেন। অলাভজনক সংস্থা 'মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৫৯ সালে ইরানের কেন্দ্রীয় ইয়াজদ প্রদেশের মেয়বোদ শহরের এক ধর্মীয় পরিবারে তার জন্ম। ইরানে প্রচলিত বিশ্বাস মতে, আরাফি পরিবার মূলত ১৯০০ শতাব্দীতে ইসলাম গ্রহণকারী পার্সি (জোরোস্ট্রিয়ান) বংশোদ্ভূত। ৬৭ বছর বয়সী এই আলেম আরবি ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ এবং তার বেশ কিছু বই ও নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
১৯৮৯ সালে খামেনি সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পরই আরাফির উত্থান শুরু হয়। এর আগে ধর্মীয় মহলের বাইরে তিনি পরিচিত ছিলেন না। তবে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু আরাফিকে বিশ্বজুড়ে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছে।
আরাফি মাত্র ১১ বছর বয়সে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষার জন্য পবিত্র শহর কোমে চলে যান। তার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অনুযায়ী, তৎকালীন পশ্চিমাপন্থী শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরোধিতার কারণে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি কারাবরণ করেন। ১৯৯২ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তিনি মেয়বোদ শহরের জুমার নামাজের ইমাম নিযুক্ত হন, যা খামেনির গভীর আস্থার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
পরে তিনি ইরানের মাদ্রাসাগুলোর পরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি কোমের আল-মুস্তফা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে খামেনি তাকে প্রভাবশালী ১২ সদস্যের 'গার্ডিয়ান কাউন্সিল'-এ নিযুক্ত করেন। যদিও ২০১৬ সালে তিনি 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস' নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি, তবুও তাকে জাতীয় নিরাপত্তা এবং বিদেশি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি বর্তমানে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস-এর দ্বিতীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট।
ইরানের অন্তর্বর্তী কাউন্সিলে আরাফি
আরাফিকে ইরানের 'লিডারশিপ কাউন্সিল'-এর আইনজ্ঞ সদস্য হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত এই কাউন্সিল রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।
কাউন্সিলের তিন সদস্যের মধ্যে আরাফি সবচেয়ে তরুণ। রোববার তিনি এক হুঙ্কার দিয়ে বলেন, জাতি বিপ্লবের পথেই চলবে এবং জনগণ, প্রিয় তরুণ ও শিক্ষার্থীদের রক্তের প্রতিশোধ নেবে।
পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তার ও মোহসেনি-এজেইর নাম আলোচনায় আছে।
তবে এরই মধ্যে কিছু অসমর্থিত খবর পাওয়া যাচ্ছে যে, ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলায় আরাফি নিহত হয়েছেন। সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিন ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের বরাতে এক্সে দাবি করেছেন যে, ‘ইরানের ভারপ্রাপ্ত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আরাফি তেহরানে নতুন হামলায় নিহত হয়েছেন।’