আন্তর্জাতিক ডেস্ক : খামেনির মৃত্যুর পর থেকে চলমান সর্বাত্মক সংঘাতের সপ্তম দিনে সরাসরি প্রতিপক্ষের ‘হৃৎপিণ্ডে’ হামলা করল ইরান। আইআরজিসির ‘নতুন অস্ত্র’ মাঠে নামানোর কড়া হুঁশিয়ারির পরপরই ইসরাইলের প্রধান লাইফলাইন-বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে প্রথমবারের মতো আঘাত হানল ইরানের ‘নতুন প্রজন্ম’র অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র। ধসে পড়ল দেশটির নিশ্ছিদ্র আকাশ প্রতিরক্ষার অহংকার।
একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হাইফা বন্দর ও রাজধানী তেলআবিবের বিভিন্ন স্থানেও মুহুর্মুহু হামলা করেছে খামেনির উত্তরসূরিরা। এতদিন ‘সস্তা’ ড্রোনের ঝাঁক সামলাতেই দিশেহারা তেল আবিব ও পেন্টাগনের রাতের ঘুম এখন হারাম; কারণ তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে-তারা কোনো যুদ্ধবিরতির ভিক্ষা চাইছে না, বরং দীর্ঘস্থায়ী বড় যুদ্ধের জন্যই প্রস্তুত।
ইরানের প্রবল প্রতিরোধের মুখে দিশেহারা যুক্তরাষ্ট্রও। মাত্র ৩ দিন আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, ইরানে স্থলসেনা পাঠানো নিয়ে আমার কোনো জড়তা নেই। সেই ট্রাম্পই এখন সুর বদলে বলছেন-ইরানে সেনা পাঠানো সময়ের অপচয় মাত্র। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই প্রবল প্রতিরোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধপ্রস্তুতির কারণেই ট্রাম্প স্থল অভিযানের দুঃস্বপ্ন থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তবে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ধরে রেখে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেছেন, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানও কোনো ধরনের সমঝোতা বা অস্ত্রবিরতিতে যাবে না। লড়াই অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ইরানের ভূখণ্ডেই ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের পতন হবে। আরব দেশগুলোতে হামলার বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি আরও বলেন, আমরা কোনো মুসলিম দেশে হামলা করিনি। আমাদের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল শুধু এসব দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো।
এদিকে, ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলও বড় পরিসরে সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানে পূর্ণশক্তিতে হামলা চালানো হচ্ছে। তার দাবি, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ৪ মিনিটের মধ্যেই তাদের মিসাইল লঞ্চারগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে মার্কিন বাহিনী। এছাড়া ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরানের অন্তত ৩০টি জাহাজ ধ্বংস করারও দাবি করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তেহরানের কাছে যে সামরিক বাংকারগুলোতে ইরানের শীর্ষ নেতারা অবস্থান করছিলেন, সেখানে প্রায় অর্ধশত যুদ্ধবিমান নিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। এর আগে তেহরানের আজাদি স্টেডিয়ামেও হামলা হয়েছে। সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বাইরে ইরানের বিভিন্ন আবাসিক এলাকাতেও ক্রমাগত হামলা হচ্ছে।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, এসব হামলায় এখন পর্যন্ত ইরানের ৩ হাজার ৬৪৩ বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অসংখ্য বাণিজ্যিক ভবন, সেবাকেন্দ্র, স্কুল ও হাসপাতাল। ভয়াবহ এই সংঘাতে ৭ দিনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৩২ জনে। ২ হাজারের বেশি আহত ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে ৬২৫-এর বেশি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে।
আহত সবচেয়ে কম বয়সি লোরেস্তান প্রদেশের পোলডোখতার থেকে আসা চার মাস বয়সি একটি মেয়েশিশু। সবচেয়ে প্রবীণ হলেন কুর্দিস্তান প্রদেশের সাক্কেজ এলাকার ৯৪ বছর বয়সি একজন নারী।
নতুন দফায় হামলা শুরু করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এটা তাদের ২৩তম দফায় হামলা। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই ‘নতুন অস্ত্র’ মাঠে নামানোর ঘোষণা দেয় আইআরজিসি। এক হুংকারেই নড়েচড়ে বসেছে পশ্চিমা গোয়েন্দারা।
আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সাময়িকী ও সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, এই ‘নতুন অস্ত্রে’ থাকতে পারে তাদের বহুল আলোচিত হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ফাত্তাহ’ সিরিজের চূড়ান্ত সংস্করণ। যা শব্দের চেয়েও অন্তত ১৫ গুণ বেশি গতিতে ছুটতে পারে। এই গতির সামনে ইসরাইলের বিখ্যাত ‘আয়রন ডোম’ বা যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্যাট্রিয়ট’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আক্ষরিক অর্থেই অকেজো হয়ে পড়বে।
এছাড়া মাটির শত ফুট গভীরে লুকানো ‘মিসাইল সিটি’ থেকে ভারী ওয়্যারহেডযুক্ত কঠিন জ্বালানির ক্ষেপণাস্ত্র এবং রাডার ফাঁকি দেওয়া স্টিলথ প্রযুক্তির নতুন ড্রোন মাঠে নামাতে পারে তেহরান। পশ্চিমা গোয়েন্দাদের সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হলো-ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এই সমরাস্ত্রগুলোর প্রকৃত সক্ষমতা সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যই নেই।
পালটা পদক্ষেপে পিছু হটছে না যুক্তরাষ্ট্রও। শুক্রবার দুপুরের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের আকাশ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দেন হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। এই সময়ের মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের অবসান ঘটবে। চলমান সংঘাতে চরম বিপাকে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও।
ইরানের অবরোধ ও হামলার জেরে পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরে আটকা পড়েছে ফ্রান্সের অন্তত ৬০টি বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ। কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব ও জর্ডানে সপ্তম দিনেও হামলা চালায় তেহরান। খবর বিবিসি, এএফপি, আলজাজিরা, রয়টার্স ও তাসনিম নিউজসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের।
‘কিছু দেশ মধ্যস্থতার উদ্যোগ শুরু করেছে’-ইরানের প্রেসিডেন্ট : ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, কিছু দেশ মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা শুরু করেছে, যদিও তিনি নির্দিষ্ট করে কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, কিছু দেশ মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা শুরু করেছে। পরিষ্কার বলি, আমরা অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ, তবে আমাদের জাতির মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো দ্বিধা নেই। মধ্যস্থতা তাদের উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত, যারা ইরানি জনগণকে অবমূল্যায়ন করেছে।
‘নতুন প্রজন্ম’র ক্ষেপণাস্ত্রে গুঁড়িয়ে গেল বেন গুরিয়ন : ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর বেন গুরিয়নে হামলা চালানোর পর ইরান জানিয়েছে, নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেই এই হামলা চালানো হয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তাদের নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত আমেরিকান ঘাঁটিগুলোতেও হামলা চালানো হয়েছে। একই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরাইলের হাইফা ও তেলআবিবেও হামলা চালানো হয়।
বি২ বিমান থেকে বোমা ফেলল যুক্তরাষ্ট্র : তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। শুক্রবার প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র বি২ বিমান থেকে বোমা হামলা করার কথা জানিয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, শুক্রবার ভোরে বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমানগুলো ইরানের ভূগর্ভস্থ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারগুলোর ওপর ডজনখানেক ২০০০ পাউন্ডের ‘পেনিট্রেটর’ বোমা নিক্ষেপ করেছে।
পারস্য উপসাগরে আটকা ৫২টি ফরাসি জাহাজ : মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ৬০টি ফরাসি জাহাজ সাগরে আটকা পড়েছে। ফ্রান্সের পরিবহণমন্ত্রী ফিলিপ তাবারো এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পারস্য উপসাগরে ৫২টি এবং লোহিত সাগরে ৮টি জাহাজ আটকা পড়েছে। আমরা জাহাজগুলোর ক্রুদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছি, কারণ সেখানে বেশকিছু ফরাসি নাবিক রয়েছেন।
ইরানি জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে শ্রীলংকা : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঠিক একদিন পর শ্রীলংকা দ্বিতীয় একটি ইরানি জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। শ্রীলংকান প্রেসিডেন্ট অনুঢ়া কুমারা দিশানায়েকে শুক্রবার গণমাধ্যমকে বলেন, ২৬ ফেব্রুয়ারি ইরান শ্রীলংকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ৯ থেকে ১৩ মার্চের মধ্যে তিনটি জাহাজ দ্বীপরাষ্ট্রের বন্দরে প্রবেশের অনুমতি চেয়েছিল। জাহাজগুলো এরই মধ্যে শ্রীলংকার জলসীমার কাছে অবস্থান করছিল। মানবিক অনুরোধে জাহাজের দুই কর্মকর্তাকে দেশে আনা হয়েছে।
হাইফা বন্দরে হিজবুল্লাহর হামলা : ইসরাইলি স্থলবাহিনী ও হাইফা বন্দর লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালিয়েছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। শুক্রবার ভোরে এসব হামলা চালানো হয়। পাশাপাশি সম্প্রতি লেবাননের ভূখণ্ডে প্রবেশকারী ইসরাইলিদের ওপরও হামলা চালায় হিজবুল্লাহ।
লেবানন সীমান্তে ইসরাইলের মন্ত্রীর ছেলে আহত : লেবানন সীমান্তে সামরিক কার্যক্রমে অংশ নিতে গিয়ে ইসরাইলের কয়েকজন সেনা আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ইসরাইলের বর্তমান অর্থমন্ত্রী বেজলাল স্মর্টিচের ছেলেও আছে।
কুয়েত উপকূলে মার্কিন তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা : ইরানের সশস্ত্র বাহিনী শুক্রবার জানিয়েছে, তারা কুয়েত উপকূলে মার্কিন তেলবাহী একটি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। এতে ওই ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়।
ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে বিকট বিস্ফোরণ : তেলআবিবসহ ইসরাইলের বিভিন্ন প্রান্তে শুক্রবার সকালে বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে এতে ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
৬টি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংসের দাবি : ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, তাদের বিমানবাহিনী রাতভর হামলা চালিয়ে ৬টি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংস করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলি ভূখণ্ডের দিকে ছোড়ার আগেই সেগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছে।