আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়ায় আবারও নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা। এতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে-চাপের সময়ে কোন সম্পদ সত্যিই নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করে।
তবে সিদ্ধান্তটা সহজ নয়। কারণ ঐতিহ্যগতভাবে নিরাপদ ধরা হয় এমন অনেক সম্পদই এবার অপ্রত্যাশিত আচরণ করছে। একদিকে স্বর্ণের দাম দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে গত বছর দুর্বল থাকা ডলারও আবার শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
ডলার পরীক্ষায় এগিয়ে
চলতি সপ্তাহে নিরাপদ আশ্রয়ের সম্পদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স করেছে মার্কিন ডলার।
ডলার সূচক-যা ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের অবস্থান দেখায়-এই সপ্তাহে প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। এমনকি সাধারণত সংকটের সময়ে শক্তিশালী থাকা সুইস ফ্রাঙ্ক ও জাপানি ইয়েনের বিপরীতেও ডলার শক্তিশালী হয়েছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গত এপ্রিলে শুল্ক নিয়ে অস্থিরতার সময় শেয়ারবাজারে ধস নামলে ডলার দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তখন এর নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
তথ্য বলছে, এখন বিনিয়োগকারীরা মূলত স্বল্পমেয়াদি ডলার নগদ অর্থের দিকে ঝুঁকছেন, ডলারভিত্তিক অন্য সম্পদের দিকে নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন জ্বালানি রফতানিকারক দেশ হওয়ায় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের বেশি হলে ডলার কিছুটা সুবিধা পায়।
মরগান স্ট্যানলির বৈদেশিক মুদ্রা কৌশল বিভাগের প্রধান জেমস লর্ড বলেন, ডলারের কিছু নিরাপদ আশ্রয়ের বৈশিষ্ট্য আছে, তবে তা পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজ করে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অনিশ্চয়তা ডলারের নিরাপদ আশ্রয়ের ভাবমূর্তিকে কিছুটা ক্ষয় করেছে।
সরকারি বন্ডে আগ্রহ কম
সাধারণত ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ বাড়ে। তবে এবার সেই প্রবণতা তেমন দেখা যাচ্ছে না।
বিনিয়োগকারীরা এখন বন্ডের নিরাপত্তার চেয়ে মুদ্রাস্ফীতির সম্ভাবনা বিবেচনা করেই বেশি লেনদেন করছেন।
এছাড়া জার্মানির ঋণ নীতিতে পরিবর্তন ও বাড়তি সরকারি ঋণ নেয়ার আশঙ্কাও বন্ডের আকর্ষণ কমিয়েছে।
ইউরোজোনের মানদণ্ড হিসেবে ধরা জার্মানির ১০ বছরের বন্ডের ফলন এই সপ্তাহে প্রায় ১৪ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে।
র্যাথবোনসের স্থায়ী আয়ের প্রধান ব্রাইন জোন্স বলেন, জার্মান বন্ড সাধারণত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হলেও ঋণ বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে এতে বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
স্বর্ণের অবস্থান শক্তিশালী
এই দশকে এখন পর্যন্ত স্বর্ণের দাম প্রায় ২৪০ শতাংশ বেড়েছে। এতে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
তবে এর দামও অস্থির। সম্প্রতি হঠাৎ করে স্বর্ণের দাম কমে গিয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় অন্য খাতে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কিছু বিনিয়োগকারী স্বর্ণ বিক্রি করেছিলেন।
তবুও মুদ্রাস্ফীতি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং উচ্চ ঋণের ঝুঁকি-এই তিন কারণে স্বর্ণের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে অবস্থান অটুট থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
স্টেট স্ট্রিট জানিয়েছে, বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে স্বর্ণের অংশ এখনও তুলনামূলক কম। বিশ্বব্যাপী তহবিল সম্পদের মধ্যে স্বর্ণভিত্তিক এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডে বিনিয়োগ ১ শতাংশেরও নিচে, যেখানে কৌশলগতভাবে ৫ থেকে ১০ শতাংশ থাকার কথা বলা হয়।
স্টেট স্ট্রিট ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের গোল্ড স্ট্র্যাটেজি প্রধান আকাশ দোশি বলেন, বর্তমান প্রবণতা থাকলে ভবিষ্যতে স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ডলারের তুলনায় ৬ হাজার ডলারে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ইয়েন ও ফ্রাঙ্ক পিছিয়ে
দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ মুদ্রা হিসেবে পরিচিত সুইস ফ্রাঙ্ক ও জাপানি ইয়েন এই সপ্তাহে যথাক্রমে প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে।
সেন্ট জেমস প্লেসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা জাস্টিন ওনুয়েকউসি বলেন, মূল্যায়নের দিক থেকে জাপানি ইয়েন তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় এবং এই পরিবেশে সুরক্ষা দিতে পারে।
তবে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানে তাকাইচি সুদের হার বাড়ানোর বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন-এমন খবর প্রকাশের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ইয়েনের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক মুদ্রার অতিরিক্ত শক্তি ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে-এমন আশঙ্কায় ফ্রাঙ্কের উত্থানও সীমিত থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গোল্ডম্যান শ্যাক্সের কৌশলবিদ টেরেসা আলভেস বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বাড়ায় ফ্রাঙ্কের নিরাপদ আশ্রয়ের বৈশিষ্ট্য কিছুটা কমে যেতে পারে।
প্রতিরক্ষামূলক শেয়ারেও সুবিধা নেই
বাজারে অস্থিরতার সময় সাধারণত ইউটিলিটি বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মতো প্রতিরক্ষামূলক খাতের শেয়ার তুলনামূলক ভালো করে। তবে এবার সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না।
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে ইউটিলিটি খাত প্রায় ১ শতাংশ এবং ভোক্তা নিত্যপণ্যের খাত প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকও কমেছে।
ইউরোপেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। সেখানে ইউটিলিটি খাত প্রায় ৩ শতাংশ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খাত প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে, যেখানে স্টক্স ৬০০ সূচক কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, এর একটি কারণ হলো-এই খাতগুলোর শেয়ার আগেই ভালো পারফরম্যান্স করছিল। যুদ্ধ শুরুর আগে অবকাঠামো ও শিল্পখাতের মতো 'শক্তিশালী সম্পদে' বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রবণতাও ছিল।
টেম্পলটন গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্টসের পোর্টফোলিও ম্যানেজার জেমস ব্রিস্টো বলেন, বর্তমান সুদের হারের পরিবেশে প্রতিরক্ষামূলক খাতে বিনিয়োগ করতে হলে মূল্যায়নের দিকটি খুব সতর্কভাবে দেখতে হয়। সূত্র- রয়টার্স