আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের ২০ দিন পার হয়ে তৃতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করার মুহূর্তে যুদ্ধের রূপ ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। এবার সরাসরি জ্বালানি স্থাপনা ও তেল-গ্যাস অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করায় তার বিধ্বংসী প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেনের সময় অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়েছে। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ও বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্রে সরাসরি হামলার খবরের পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হওয়া চরম আতঙ্ক বিশ্ববাজারকে এই নজিরবিহীন অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বৈশ্বিক তেলের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এদিন সর্বোচ্চ ১১৮.২৭ ডলারে উঠে যায়। একই সময়ে মার্কিন ক্রুড তেলের দামও পাল্লা দিয়ে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি এবং কাতারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের পর বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার শঙ্কায় এই আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, দেশটির অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ‘সাউথ পার্স’ প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র এবং ‘আসালেইয়ে’ তেল স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে। এই খবরের পরপরই বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।
অন্যদিকে সৌদি আরবে আকাশপথে আসা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির খবরও তেলের বাজারকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, যদি প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি হবে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হোয়াইট হাউস সাময়িকভাবে ‘জোন্স অ্যাক্ট’ স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে আগামী ৬০ দিনের জন্য বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজগুলো মার্কিন বন্দরগুলোর মধ্যে পণ্য পরিবহনের অনুমতি পাবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশেষ পদক্ষেপও তেলের ঊর্ধ্বমুখী দামকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। তেলের বাজারে প্রতিদিন দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে দাম নিষ্পত্তি হলেও সপ্তাহের ২৪ ঘণ্টা লেনদেন চলায় অস্থিরতা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এবারের সংকট কেবল সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী এক জ্বালানি দুর্ভিক্ষের দিকে এগোচ্ছে। টরটয়েজ ক্যাপিটালের জ্যেষ্ঠ পোর্টফোলিও ম্যানেজার রব থামেল এ প্রসঙ্গে বলেন, “যদি জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে যায়, তবে সংকটের সময়সীমা অনেক বেড়ে যায়। কারণ একটি তেলের শোধনাগার বা গ্যাসক্ষেত্র পুনর্নির্মাণ করতে মাস এমনকি বছরও লেগে যেতে পারে। তেলের বাজার মূলত এই দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির কথা ভেবেই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।”
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ তেল উৎপাদনকারী দেশ তাদের স্থাপনাগুলোতে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সৌদি আরব বা কুয়েতের মতো বড় উৎপাদক দেশগুলোর সরবরাহ লাইন স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তেলের দাম অচিরেই ১৫০ ডলার স্পর্শ করতে পারে। এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং চরম মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলবে। এখন আন্তর্জাতিক মহলের একমাত্র প্রার্থনা—দ্রুত কোনো কূটনৈতিক সমাধান যাতে বিশ্ব অর্থনীতিকে এই মহাপ্রলয় থেকে রক্ষা করতে পারে।