আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ইরানের সঙ্গে ১৫ সপ্তাহের যুদ্ধের পর সংঘাত শুরুর আগের অবস্থার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা এখন আরও খারাপ। আজ শুক্রবার (১৯ জুন) সম্প্রচারিত এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
ওবামা বলেন, ‘আমরা একটি যুদ্ধ করেছি, শত শত কোটি ডলার ব্যয় করেছি, আমাদের সামরিক বাহিনীর ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছি। অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। অথচ এখন মনে হচ্ছে আমরা যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থানেই ফিরে এসেছি, বরং হয়তো একটু বেশি খারাপ অবস্থায়।’
শিকাগোতে ওবামা প্রেসিডেনশিয়াল সেন্টার উদ্বোধনের আগে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে তিনি চলতি সপ্তাহে প্যারিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক নিয়েও মন্তব্য করেন। ওবামা বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি দেখতে পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত। আমি আশা করি এটি টিকে থাকবে।’
ইরান যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন তুলে আসছেন ওবামা। তিনি আবারও সমালোচনা করেন ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সেই সিদ্ধান্তের, যার মাধ্যমে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করা হয়েছিল।
জয়েন্ট কমপ্রিহেন্সিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন বা জেসিপিওএ নামে পরিচিত ওই চুক্তির আওতায় ইরান পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয়েছিল, বিনিময়ে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল।
ওবামার ভাষায়, ‘ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন, যার ফলে ইরান আরও বেশি পারমাণবিক সক্ষমতা গড়ে তোলে।’
এদিকে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ড সফর স্থগিত করেছেন। সেখানে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে নতুন দফা আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল তার।
অন্যদিকে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ভবিষ্যতের যেকোনো আলোচনায় তেহরানের ‘রেড লাইন’কে সম্মান করতে হবে। তিনি বলেন, ‘পূর্ববর্তী আলোচনাগুলোতে যেমন দেখিয়েছি, তেমনি আমরা আমাদের নির্ধারিত শর্ত ও রেড লাইনের প্রতি অটল থাকব এবং ইরানি জাতির স্বার্থ রক্ষা করব।’
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘প্রতিপক্ষ যদি অতিরিক্ত দাবি তোলে, তাহলে আমরা প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুত এবং কঠোর জবাব দিতে দ্বিধা করব না।’
অন্যদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘শান্তি পরিকল্পনার সুফল ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র পেতে শুরু করেছে। জ্বালানির দাম কমছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস হয়েছে, তাদের প্রচলিত সামরিক শক্তি ভেঙে পড়েছে এবং প্রতিবেশীদের জন্য তাদের হুমকি দেওয়ার সক্ষমতাও অনেকটাই কমে গেছে।’
তিনি ট্রাম্পের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট এই চুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ইরান যদি শর্ত না মানে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনো সব ধরনের চাপ প্রয়োগের উপায় রয়েছে।
তবে জ্বালানি খাতের কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় কৌশলগত মজুত পুনর্গঠনের চাহিদা বরং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
এক্সন মবিলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নিল চ্যাপম্যান বলেন, তেলের মজুত সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছালে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ থেকে ১৬০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আমরা এখন বিভাজন ও অস্থিরতার একটি সময় পার করছি।’
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী রাখতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় রাখার দায়িত্ব নাগরিকদেরই নিতে হবে এবং এটিকে অতীতের বিষয় বলে মনে করার সুযোগ নেই। তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান