আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর ঘোষণা দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সোমবার (৩১ আগস্ট) কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে এই ঘোষণা দেন তিনি। বৈঠকে মোদী বলেন, আগামী দিনে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য আরও বাড়ানো ও বহুমুখী করার ইচ্ছা রয়েছে ভারতের।
যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে ইরান ও এর সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক সরকারি অর্থনৈতিক অভিযান’ শুরু করার এক সপ্তাহের মাথায় মোদীর এই মন্তব্য সবার নজর কেড়েছে। পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকটি ছিল গত ছয় মাস আগে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পর দুই নেতার প্রথম সাক্ষাৎ।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মোদী বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছি। মোদীর পোস্টে বলা হয়, ‘আগামী দিনে আমরা আমাদের বাণিজ্যিক পণ্যের পরিধি বাড়াতে ও তা বহুমুখী করতে চাই।
তিনি আরও বলেন, অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে যে কোনো ধরনের প্রচেষ্টাকে ভারত সমর্থন করে যাবে।
তবে মোদী বাণিজ্য বাড়ানোর মন্তব্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। তবে মন্তব্যটি আন্তর্জাতিকভাবে নজর কেড়েছে। কারণ, এটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় ভারত নিজেও ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য কমিয়ে এনেছে।
ঐতিহাসিকভাবে ইরানের সঙ্গে ভারতের বড় ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিষয়ক নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ১৭.০৩ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১.৬৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
এদিকে, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ তেহরানকে বাণিজ্যিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে নতুন যেসব ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে, সেগুলোর মধ্যেও ভারত কীভাবে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াবে, সে বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রিকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মূলত এমন নতুন সম্ভাবনা খুঁজে দেখার কথা বলেছেন, যেগুলো ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে অর্থায়ন, বিমা, পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যবস্থার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।
বর্তমানে ভারত ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্য বেসরকারি পক্ষগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এসব পক্ষকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থার নানা বিধিনিষেধ ও বাস্তবতা মোকাবিলা করেই বাণিজ্য করতে হয়।
ইরানের পক্ষ থেকে পরিবহন ও সামুদ্রিক বিষয়ে সহযোগিতার প্রসঙ্গে চাবাহার বন্দরের বিষয়টি উত্থাপন করা হলে বিক্রম মিশ্রি বলেন, এই কৌশলগত বন্দরের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, ভারত বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে একটি টেকসই পথ খুঁজে বের করা যায়, বিশেষ করে অঞ্চলটিতে চাবাহার বন্দরের ভূমিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে।
চাবাহার বন্দরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড়ের মেয়াদ চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল শেষ হয়ে যায়। এর ফলে ভারতকে ওই বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব থেকে সরে আসতে হয়। চাবাহার বন্দরে ভারত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে।
ভারতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস পেজেশকিয়ানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর ব্যাপক সক্ষমতা ইরান ও ভারতের রয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা শক্তিশালী করার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলা করতে পারলে আমরা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারব।
মাসুদ পেজেশকিয়ান ছাড়াও মোদী রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। চলতি বছর এটিই ছিল দুই নেতার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ।
বিক্রম মিশ্রি জানান, বৈঠকে দুই শীর্ষ নেতা দেশ দুটির মধ্যে বাড়তে থাকা বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে কথা বলেন। বিশেষ করে, ভারত রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল কেনা শুরু করার পর এই বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। তিনি বলেন, উভয় পক্ষই বিষয়টি স্বীকার করেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জানান, বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাশিয়ায় ভারতের রপ্তানি বাড়ানোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আলোচনা চলছে। গত বছর প্রেসিডেন্ট পুতিন বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে এলে প্রধানমন্ত্রী মোদী তার কাছে একটি নথি তুলে দিয়েছিলেন। ওই নথিতে রাশিয়ায় ভারতীয় পণ্যের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা এখনো রয়েছে, সেগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। তার মধ্যে কিছু বিষয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।