শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:১৪:০৪

হঠাৎ কেন স্বর্ণ কেনার হিড়িক? জানা গেল যে কারণ

হঠাৎ কেন স্বর্ণ কেনার হিড়িক? জানা গেল যে কারণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : হঠাৎ কেন স্বর্ণ কেনার হিড়িক? মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে চীন। একই সঙ্গে দেশটির অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে সঞ্চয় সুরক্ষিত রাখতে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও।

চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়না (পিবিওসি) সেপ্টেম্বরে টানা ২৩তম মাসের মতো স্বর্ণ কেনার কথা জানিয়েছে। ওই মাসে প্রায় তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ কিনেছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিকভাবে স্বর্ণ কেনার মধ্য দিয়ে বিশাল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ঝুঁকি কমানোর দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বেইজিং।

এ ক্ষেত্রে উদ্বেগের অন্যতম কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সরকারি ঋণ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর অন্য দেশের সম্পদ জব্দ করার নজির। বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতি ও গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য বিদেশে সম্পদ রাখার ঝুঁকি এ ঘটনা সামনে এনেছে। অন্যদিকে, দেশে কেনা ও সংরক্ষণ করা স্বর্ণের নাগাল পেতে অন্য কোনো সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হয় না। ফলে নিষেধাজ্ঞা বা সম্পদ জব্দের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাওয়ার একটি উপায় হিসেবে স্বর্ণকে দেখছে চীন।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সাধারণ মানুষের স্বর্ণ কেনার পেছনে কারণ এক নয়। বেইজিং যেখানে আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে চাইছে, সেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নিজেদের সঞ্চয় সুরক্ষিত রাখার বিকল্প খুঁজছেন।

কতটা স্বর্ণ কিনেছে চীন?

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ২৩ টন স্বর্ণ মজুতে যোগ করেছে। এতে দেশটির ঘোষিত স্বর্ণের মজুত বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৪১০ টনে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর এটিই ছিল চীনের সবচেয়ে বড় মাসিক স্বর্ণ কেনার পরিমাণ।

সেপ্টেম্বরের শেষে চীনের মোট সরকারি রিজার্ভের ৮ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল স্বর্ণ। ২০২৪ সালের শেষে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক লেনদেন পরিচালনা এবং আর্থিক সংকট মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন সম্পদ রিজার্ভ হিসেবে সংরক্ষণ করে। এর মধ্যে সাধারণত বৈদেশিক মুদ্রা, বিদেশি সরকারের ঋণপত্র ও স্বর্ণ থাকে।

চীনের অভ্যন্তরেও স্বর্ণের ব্যক্তিগত চাহিদা বেড়েছে। চায়না গোল্ড অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে দেশটিতে স্বর্ণের বার ও মুদ্রা কেনার পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।

এমনকি দাম কমলেও স্বর্ণ কেনা অব্যাহত রেখেছেন বিনিয়োগকারীরা। চলতি মাসে স্বর্ণের দাম প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, শক্তিশালী মার্কিন ডলার এবং দেশটির সরকারি ঋণপত্রের উচ্চ মুনাফা স্বর্ণের দাম কমার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়তে থাকায় সুদ দেয় এমন বিনিয়োগের আকর্ষণও বেড়েছে। ফলে যেসব সম্পদ থেকে নিয়মিত আয় পাওয়া যায়, সেগুলোর তুলনায় স্বর্ণ কিছু বিনিয়োগকারীর কাছে কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

কেন স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে চীন?

জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টভিত্তিক কমার্জব্যাংকের পণ্য গবেষণা বিভাগের প্রধান থু ল্যান নগুয়েনের মতে, চীনের স্বর্ণ কেনার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মার্কিন ট্রেজারি নামে পরিচিত দেশটির সরকারি ঋণপত্রের ওপর নির্ভরতা কমানো।

চীনের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড় অংশ ডলারভিত্তিক সম্পদে রাখা হয়েছে। তাই স্বর্ণের মজুত বাড়ানোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি কমাতে চাইছে বেইজিং। নগুয়েন আল জাজিরাকে বলেন, ‘চীনের স্বর্ণ কেনা রিজার্ভকে আরও স্থিতিশীল করার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।’

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলারের বৈদেশিক সম্পদ জব্দ করে। এ ঘটনা দেখিয়েছে, বিদেশে রাখা রিজার্ভ কত দ্রুত ব্যবহার-অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত তৈরি হলে চীনের বৈদেশিক সম্পদের কিছু অংশও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে; এমন আশঙ্কা রয়েছে। নগুয়েন বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে দেশে রাখা স্বর্ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে। এটি অন্য কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল নয়। ফলে নিষেধাজ্ঞা বা সম্পদ জব্দের ঝুঁকিও অনেক কম।’

ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অর্থনৈতিক ও রাজস্বসংক্রান্ত ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি এটিকে প্রাথমিকভাবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা হিসেবেই ব্যাখ্যা করব।’

যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা ঋণও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। চলতি বছরের শুরুতে দেশটির সরকারি ঋণ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস পূর্বাভাস দেয়, জনগণের হাতে থাকা ফেডারেল ঋণ ২০২৬ সালে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৩৬ সালে ১২০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। চীনের হাতে থাকা মার্কিন ঋণপত্রের বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্বর্ণকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে দেশটি।

স্বর্ণ কিনছেন চীনা পরিবারগুলোও

চীনের সাধারণ মানুষের স্বর্ণ কেনার পেছনে রয়েছে ভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক উদ্বেগ। অন্য বিনিয়োগের ওপর আস্থা কমে গেলে সঞ্চয় ধরে রাখার বিকল্প হিসেবে স্বর্ণের আকর্ষণ বাড়ে। নগুয়েন বলেন, ‘স্বর্ণের প্রবল চাহিদা আংশিকভাবে বিকল্প সঞ্চয়স্থানের অনুসন্ধানের প্রতিফলন হতে পারে।’

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল চীনের দুর্বল শেয়ারবাজারকে স্বর্ণের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে দেশটির আবাসন খাতও চাপের মধ্যে রয়েছে। অতিরিক্ত ঋণ ও অতিরিক্ত নির্মাণের কারণে বাড়ির দাম কমছে, ফলে আবাসন খাত অনেকের কাছে দুর্বল বিনিয়োগের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন অনেকে।

ডলারের বৈশ্বিক অবস্থানে কী প্রভাব পড়বে?

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের স্বর্ণ কেনা বাড়লেও তা ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যের অবসানের ইঙ্গিত দেয় না। নগুয়েন বলেন, ‘ডলার থেকে বড় ধরনের সরে আসার ঘটনা হিসেবে এটিকে বর্ণনা করার ব্যাপারে আমি সতর্ক থাকব। ডলার এখনো বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা।’

তবে চীনসহ বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি নতুন রিজার্ভের বড় অংশ স্বর্ণে বিনিয়োগ করে এবং আগের তুলনায় কম মার্কিন সম্পদ কেনে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণপত্রের চাহিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস দুর্বল হতে পারে। এর প্রভাব নির্ভর করবে পরিবর্তনটি কতটা ব্যাপক ও দ্রুত ঘটে, তার ওপর।

নগুয়েনের মতে, ‘মূল বিষয় হলো, এটি ডলারকে আকস্মিকভাবে বর্জন করার পরিবর্তে ধীরে ধীরে রিজার্ভের বৈচিত্র্য বাড়ানোর প্রক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এ প্রবণতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে না পড়া এবং দ্রুত গতি না পাওয়া পর্যন্ত মার্কিন অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব সীমিত থাকবে।’

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক লেনদেন পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সহজলভ্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। এসব লেনদেনে ডলার এখনো প্রধান ভূমিকা পালন করে। তাই স্বর্ণ আর্থিক সুরক্ষা দিলেও ডলার রিজার্ভের সব কাজ সরাসরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

আর কোন দেশ স্বর্ণ কিনছে?

নগুয়েনের মতে, চীন এমন একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ, যা বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে। এই প্রবণতা বিশেষ করে উদীয়মান বাজারের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে লক্ষণীয়। তবে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি পুরো কারণের একটি অংশ মাত্র।

স্বর্ণ কেনার ক্ষেত্রে পোল্যান্ডও গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা হয়ে উঠেছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ৩১ টন এবং জুলাইয়ে আরও ৮ টন স্বর্ণ কিনেছে।

তবে কোনো দেশের স্বর্ণের মজুত বেশি হলেই যে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কিনেছে, তা নয়। উদাহরণ হিসেবে, ভারত জুনে জানিয়েছে, তাদের ভৌত স্বর্ণের মজুত প্রায় ৮৮০ দশমিক ৫ টনে অপরিবর্তিত রয়েছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ভারতের স্বর্ণের রিজার্ভে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। দেশটি ২০২৫ সালে প্রায় ৪ টন স্বর্ণ কিনেছে, যেখানে ২০২৪ সালে কিনেছিল ৭৩ টন।

চীন ধারাবাহিকভাবে স্বর্ণ কিনলেও দেশটির মজুত যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম। ২০২৫ সালের শেষে চীনের স্বর্ণের মজুত প্রায় ২ হাজার ৩০০ টন হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮ হাজার ১৩৩ টন মজুতের এক-তৃতীয়াংশেরও কম।

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে।