শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:৪০:২০

প্রথম ফোল্ডেবল ফোন ‘আইফোন ডুও’র বিক্রি শুরু

 প্রথম ফোল্ডেবল ফোন ‘আইফোন ডুও’র বিক্রি শুরু

ভাঁজ করা স্মার্টফোনের বাজারে প্রথমবারের মতো প্রবেশ করেছে প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) থেকে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম ফোল্ডেবল ফোন ‘আইফোন ডুও’র বিক্রি শুরু হয়েছে। প্রচলিত স্মার্টফোনের বাজারে আইফোন যেভাবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল, নতুন এই ফোন ছোট পরিসরের ফোল্ডেবল ফোনের বাজারেও তেমন পরিবর্তন আনতে পারবে কি না, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মধ্যে।

নতুন ফোনটির বাজারে সাড়া অ্যাপলের নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জন টার্নাসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত সেপ্টেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ফোনটি উন্মোচন করেন তিনি। একই সঙ্গে স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও হুয়াওয়ে টেকনোলজিসের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েক বছর ধরে আধিপত্য থাকা ফোল্ডেবল ফোনের বাজারেও অ্যাপলের প্রবেশ নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে।

গত শুক্রবার আইফোন ডুওর প্রি-অর্ডার চালু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সরবরাহের সম্ভাব্য সময় পিছিয়ে জানুয়ারির শেষ দিকে চলে যায়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওয়া সাড়াকে ‘অসাধারণ’ বলে উল্লেখ করেছে অ্যাপল।

চাহিদা বেশি থাকলেও বিক্রির ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ দুটি ফোন প্রি-অর্ডার করতে পারছেন। পাশাপাশি সরাসরি দোকানে গিয়ে ফোন কেনার সুযোগও সীমিত রাখা হয়েছে। ফলে নতুন আইফোন বাজারে আসার সময় সাধারণত যে বিপুল ভিড় দেখা যায়, এবার তা তুলনামূলক কম ছিল।

চীন, ফ্রান্স, হংকং, ভারত ও জাপানে শুধু অনলাইনে অর্ডার করা গ্রাহকদের কাছেই ফোনটি বিক্রি করা হচ্ছে। তবে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল ৮টায় বিক্রি শুরুর আগেই অ্যাপলের দোকানের সামনে ক্রেতাদের সারি দেখা যায়।

সিডনির ৪৮ বছর বয়সি প্রকৌশলী সাইমন কৃষ্ণান ৫১২ গিগাবাইট ধারণক্ষমতার আইফোন ডুও কিনতে ৩ হাজার ৮৯৯ অস্ট্রেলীয় ডলার (২ হাজার ৭৩৪ মার্কিন ডলার) খরচ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘এটি আমার জন্য কিছুটা বিলাসবহুল পণ্য, কারণ এর দাম অনেক বেশি। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, জীবন তো খুব ছোট।’

চীনে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মেমোরি চিপের দাম বৃদ্ধির কারণে স্মার্টফোনের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। দেশটিতে টানা ছয় প্রান্তিকে স্মার্টফোন সরবরাহ কমেছে। তবে উচ্চমূল্যের ফোনের প্রতি কিছু ক্রেতার আগ্রহ এবং কম দামের ফোনের চাহিদার কারণে অ্যাপল সেখানে নিজেদের বাজার অবস্থান পুনরুদ্ধার করেছে। এতে মধ্যম দামের স্মার্টফোন নির্মাতারা প্রতিযোগিতার চাপে পড়েছে।

চীনের ২৬ বছর বয়সি স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী লিউ ওয়েইয়ের কাছে আগে থেকেই শাওমির একটি ফোল্ডেবল ফোন রয়েছে। তা সত্ত্বেও অ্যাপলের প্রথম ভাঁজ করা ফোন কিনতে তিনি সাংহাইয়ের একটি অ্যাপল স্টোরের সামনে সকাল ৬টা থেকেই অপেক্ষা করেন।

লিউ বলেন, ‘আমি বহু বছর ধরে অ্যাপলের পণ্য ব্যবহার করছি। ব্র্যান্ডটির ওপর আমার আস্থা বেশি। তাই নতুন ফোনটি ব্যবহার করে দেখার জন্য বিক্রির প্রথম দিনেই কিনেছি।’

হংকংয়ে ৩৮ বছর বয়সি মে নামের এক ক্রেতা অনলাইনে প্রি-অর্ডারের মাধ্যমে ২৫৬ গিগাবাইটের আইফোন ডুও কিনেছেন। ফোনটির দাম ১৭ হাজার ৪৯৯ হংকং ডলার। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ক্রেতা জানান, প্রায় ৪ হাজার হংকং ডলার লাভে ফোনটি বিক্রি করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। মজা করে তিনি বলেন, এই অর্থ দিয়ে কয়েক বেলার খাবারের খরচ হয়ে যাবে।

প্রাথমিক পর্যালোচনায় আইফোন ডুওর নকশা, মজবুত কাঠামো এবং প্রায় অদৃশ্য কবজার প্রশংসা করেছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা। ফোল্ডেবল ফোনের পর্দায় দৃশ্যমান ভাঁজ দীর্ঘদিন ধরেই ক্রেতাদের অনাগ্রহের অন্যতম কারণ। নতুন ফোনে সেই সমস্যা অনেকটাই কমিয়ে আনার বিষয়টিকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন তারা।

তবে ক্যামেরার কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। ফোনটিতে টেলিফটো লেন্স নেই। পাশাপাশি নতুন পর্দার আকারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তৃতীয় পক্ষের অনেক অ্যাপের আরও উন্নয়ন প্রয়োজন। এসব কারণে কিছু ক্রেতা হতাশ হতে পারেন বলে মনে করছেন পর্যালোচকেরা।

ফোনটি ভাঁজ করা অবস্থায় প্রচলিত আইফোনের তুলনায় দৈনন্দিন দ্রুত কাজ করার ক্ষেত্রে কম সুবিধাজনক বলেও মত দিয়েছেন কেউ কেউ। ফলে অ্যাপলের সব গ্রাহকের জন্য ডুও উপযুক্ত নাও হতে পারে।   

অ্যাপলবিষয়ক দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষক ও ডেয়ারিং ফায়ারবল ব্লগের লেখক জন গ্রুবার তার পর্যালোচনায় লিখেছেন, এক সপ্তাহ ফোনটি ব্যবহার করে তার ভালো লেগেছে। তবে তার কাছে এটিকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত পণ্যের চেয়ে অত্যন্ত পরিশীলিত একটি পরীক্ষামূলক সংস্করণ বলেই মনে হয়েছে, যা তিনি নিজে কিনে নিয়মিত ব্যবহার করতে চাইবেন না।

প্রযুক্তি বিশ্লেষক মার্কেস ব্রাউনলি, যিনি এমকেবিএইচডি নামে পরিচিত, তার ইউটিউব পর্যালোচনায় বলেন, যারা মূলত বার্তা আদান-প্রদান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ও ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের মতো সাধারণ কাজ করেন, তাদের জন্য ফোনটি কেনা উপযুক্ত নাও হতে পারে। তবে যাদের কাছে ২ হাজার ডলারের দাম বড় বিষয় নয় এবং নতুন ধরনের ফোন ব্যবহারের আগ্রহ রয়েছে, তাদের কাছে এটি বেশ উপভোগ্য হতে পারে। অবশ্য ফোনটির ব্যবহারপদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং ফেস আইডি না থাকার বিষয়টি মেনে নেওয়ার প্রয়োজন হবে।

চাহিদার তুলনায় ফোনের সরবরাহ কম থাকায় দোকানের সামনে অপেক্ষা করা অনেক ক্রেতা হতাশ হতে পারেন। রয়টার্সকে অ্যাপল জানিয়েছে, সরাসরি দোকানে গিয়ে ফোন কেনার সুযোগ দেশভেদে ভিন্ন হবে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বেশির ভাগ এলাকায় ফোনটির মজুত সীমিত থাকবে।  

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসির ভাইস প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিসকো জেরোনিমো বলেন, ফোল্ডেবল ফোনের বাজার বেশ কয়েক বছর ধরে থাকলেও প্রচলিত স্মার্টফোনের তুলনায় এ ধরনের ফোনের ব্যবহার এখনো সীমিত। অ্যাপলের প্রবেশ এই প্রযুক্তিকে আরও বড়সংখ্যক গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।

আইডিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ফোল্ডেবল ফোনের বাজারের মোট বিক্রয়মূল্যের ৪৪ শতাংশ দখল করতে পারে অ্যাপল। এ সময়ে বিক্রি হওয়া মোট ফোল্ডেবল ফোনের ৩১ শতাংশ হতে পারে প্রতিষ্ঠানটির ডিভাইস। ২০২৭ সালের মধ্যে বিক্রয়মূল্য ও বিক্রিত ফোনের সংখ্যার উভয় হিসাবেই এই বাজারের শীর্ষস্থানে উঠে আসতে পারে অ্যাপল।

আইফোন ডুও এক সপ্তাহ ব্যবহার করার পর জেরোনিমো বলেন, ফোনটির নকশা ও ধরন গ্রাহকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে অ্যাপল যুক্তিসংগত ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, প্রাথমিক আগ্রহকে পর্যাপ্ত সরবরাহ, ব্যাপক ব্যবহার এবং স্মার্টফোনের বাজারে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনে রূপ দেওয়া।

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে।