আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাওয়ার ব্যাপারে তেহরান আশাবাদী। দীর্ঘদিন ধরেই ইরান এই অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়ে আসছে। এবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তা সরবরাহ করতে পারেন বলে আশা করছে দেশটি।
ওই কর্মকর্তা আরো জানান, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ছেলে মোজতবা খামেনি বৃহস্পতিবার দেশটির নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ির হাতে একটি ব্যক্তিগত চিঠি দিয়ে তাকে ক্রেমলিনে পাঠান।
চিঠিতে মূলত রাশিয়ার কাছে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের দাবি জানানো হয়। এ নিয়ে দুই দেশের আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের বিপরীত।
ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, রাশিয়া ইরানকে কোনোভাবেই সহায়তা করছে না। মস্কোতে বৈঠকের পর মোহসেন রেজাই বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
পাশাপাশি যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়েও বিস্তারিত কথা হয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে নতুন একটি গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
ইরান সম্প্রতি রাশিয়ার সঙ্গে অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে বেশ কয়েকটি চুক্তি করেছে বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধে টিকে থাকা এবং দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থা বজায় রাখার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এসব চুক্তি করা হচ্ছে।
‘দ্য টেলিগ্রাফ’ জানতে পেরেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধে কীভাবে টিকে থাকা যায়, সে বিষয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছিল।
এসব প্রস্তাবের মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরো জোরদার করার বিষয়টিও ছিল।
গোপন নথিপত্রে দেখা গেছে, ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা কয়েকটি সুপারিশ তৈরি করেছিলেন। এসব সুপারিশের মূল লক্ষ্য ছিল চীন ও রাশিয়ার মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলা। বিশেষ করে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলা করা যায়।
ইরানের পার্লামেন্টের একটি গোপন কমিটি এসব সুপারিশ তৈরি করেছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার আগেই এসব প্রস্তাব তৈরি করা হয়। সুপারিশগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল দেশের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সক্ষমতা বাড়ানো।
রাশিয়ার কাছে নতুন করে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা চাওয়ার বিষয়টি ইরানের প্রতিরক্ষা নীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব হামলায় দেশটির দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে নিজেদের আকাশসীমা, পারমাণবিক স্থাপনা এবং প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে। ফলে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে রাশিয়ার কাছ থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করছে তেহরান।
বিশ্লেষক ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হতে পারে, এমন আশঙ্কায় রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে এস-৪০০-এর মতো অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত তা দেয়নি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, অস্ত্র সরবরাহে রাশিয়ার অনীহার পেছনে নিজেদেরও কিছু কারণ রয়েছে। ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাশিয়ার নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন চাপের মুখে রয়েছে। দেশটির তেল শোধনাগার, বিমানঘাঁটিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
এ কারণে ইরান অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পেতে আগ্রহী হলেও রাশিয়ার হাতে সেগুলো সরবরাহ করার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা নাও থাকতে পারে। কারণ, ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই রাশিয়াকে তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার ফাঁস হওয়া রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পের নথিপত্র থেকে জানা গেছে, ইরানের জন্য হেলিকপ্টার থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে রাশিয়া। নথিপত্র অনুযায়ী, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কারখানাগুলো ইরানের জন্য বিশেষ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সরঞ্জাম তৈরি করছে।
রপ্তানি চুক্তির নথিতে এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘কে-১০’। নথির একটি অংশে বলা হয়েছে, এই সাংকেতিক নাম দিয়ে ইরানকে বোঝানো হয়েছে।