এক্সক্লুসিভ ডেস্ক : উনিশ শতকের শেষ নাগাদ বৃটিশরা তিব্বত নিয়ে বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠে। তিব্বত তখন বহির্বিশ্বের জন্য ছিল নিষিদ্ধ এক অঞ্চল। ভারত ও তিব্বতের মধ্যে বাণিজ্য পথ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতো তিব্বতি ও সীমান্ত অঞ্চলের পাহাড়ি উপজাতিরা।
তারা ব্যতীত এই পথ ব্যবহারের অনুমতি পেতেন কেবল বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। অগত্যা, এই নিষিদ্ধ অঞ্চল সম্পর্কে জানতে সেখানে গুপ্তচর পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল বৃটিশ সরকার। পাহাড়ি লোকজন থেকে বেছে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো। তাদেরকে পাঠানো হলো বৌদ্ধ ভিক্ষুর ছদ্মবেশে।
শরৎ চন্দ্র দাস ছিলেন এমনই একজন বৃটিশ গুপ্তচর। ১৮৪৯ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রামে এক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে তার জন্ম। তিনি বৌদ্ধ ধর্মের ওপর বিস্তর পড়াশুনা করেছিলেন। রপ্ত করেছিলেন চোস্ত তিব্বতি ভাষা।
ফলে সমসাময়িক অন্যান্য গুপ্তচরের চেয়ে তিনি ছিলেন তার মিশনে সবচেয়ে বেশি সফল। তিনি দু’বার তিব্বত সফর করেন। প্রথমবার গিয়েছিলেন ১৮৭৯ সালে। চার মাসের জন্য। ১৮৮১ সালে ফের যান সেখানে। সেবার রয়েছিলেন ১৪ মাস। দ্বিতীয় সফরে গিয়ে তিনি তিব্বতের জীবনযাপন ও সংস্কৃতি নিয়ে অসংখ্য নোট রেখেছিলেন।
১৯০২ সালে নিজের এই অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ তিনি প্রকাশ করেন বই আকারে। ‘জার্নি টু লাসা’- শীর্ষক ওই বইয়ের একটি অধ্যায় সম্প্রতি পুনঃপ্রকাশ করেছে ভারতের ক্যারাভান ম্যাগাজিন। এই অধ্যায়ে তিনি তিব্বতের ত্রয়োদশ দালাইলামা থাম্পটেন গ্যাটসোর সঙ্গে সাক্ষাতের ঘটনার বর্ণনা করেছেন। থাম্পটেন ছিলেন তখন ৮ বছর বয়সী বালক।
তিনিই ছিলেন তিব্বতে অবস্থানকারী সর্বশেষ দালাইলামা। তার উত্তরসূরি হলেন বর্তমান দালাইলামা, যিনি ১৯৫৯ সালে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। ত্রয়োদশ দালাইলামার সঙ্গে শরৎ চন্দ্র দাসের সাক্ষাতের বিবরণ তার নিজের বর্ণনায় উদ্ধৃত করা হলো।
‘বিকালে আমি রাজমাতা লাচামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। তার দ্বিতীয় ছেলের গুটিবসন্ত হয়েছে। তা জানতে পেরে দুঃখ প্রকাশ করলাম। তিব্বতের প্রভু দালাইলামাকে এক নজর দেখতে না পেয়ে আমি কতটা হতাশ, তাও তাকে জানালাম। আমি বললাম, ‘আহ্! বৌদ্ধের প্রতিমূর্তিকে (দালাইলামা) রক্তে মাংসে স্বচক্ষে দেখার মতো যথেষ্ট নৈতিক যোগ্যতা আমি সম্ভবত পূর্বজন্মে অর্জন করতে পারিনি।’
জবাবে লাচাম বললেন, ‘পুন্ডিব লা, অত বিনয়ী হবেন না। যদিও তিব্বতের অভিজাতরাও সহজে দালাইলামার সঙ্গে দেখা করতে পারেন না, তবুও আমি আপনার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেবো।’ পরদিন সকালে একজন ভদ্রলোক আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। তিনি জানালেন, দালাইলামার সঙ্গে আমার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব আমার প্রস্তুত হওয়া উচিত।
দ্রুত সকালের নাস্তা গলাধঃকরণ করে, আমার সবচেয়ে ভালো পোশাকটি পরিধান করলাম। আমাকে নেয়ার জন্য ভৃত্য সমেত আরেকজন ব্যক্তি যখন এলেন, তখনও আমার প্রস্তুতি শেষ হওয়ার ঢের বাকি। ৩ আঁটি আগরবাতি, এক প্রস্থ খাতাগ (স্কার্ফ) নিয়ে আমরা ঘোড়ায় চড়ে এগুতে লাগলাম। প্রবেশদ্বার অতিক্রম করেই আমরা দেখলাম বাছুর স্তন্যপান করছে। কয়েকজন মহিলা পানি বহন করছে। তা দেখে আমার সঙ্গীরা হাসলেন।
একজন মন্তব্য করলেন যে, আমি খুব ভাগ্যবান। কারণ, এগুলো সবচেয়ে মঙ্গলজনক লক্ষণ। পোতালার (দালাইলামার প্রাসাদ) পূর্বদিকের প্রবেশদ্বারে পৌঁছে আমরা ঘোড়া থেকে নামলাম। বিশাল হলঘরের ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। এই হলঘরের উভয় পাশে প্রার্থনা-ঘণ্টা ঝুলে আছে সারিবদ্ধভাবে। প্রত্যেক পথচারী যাওয়ার সময় এগুলো নাড়িয়ে দিয়ে যান।
তিনটি পাথরের সিঁড়ি পেরিয়ে আমরা আমাদের ঘোড়া রেখে গেলাম একজনের তত্ত্বাবধানে। এগিয়ে গেলাম মূল প্রাসাদের দিকে। আমাদেরকে এগিয়ে নিতে এলেন একজন তরুণ ভিক্ষু। লোহিত প্রাসাদের নিচ তলায় পৌঁছতে আরও তিনটি সিঁড়ি টপকাতে হলো। প্রাসাদের বাইরের দেয়ালের রঙ গাঢ় লাল রঙের হওয়ায় একে লোহিত প্রাসাদ বলা হতো। তারপর আমরা আরও ছয়টি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম। এভাবেই আমরা ছুঁলাম পোতালা প্রাসাদের চূড়ায়।
এই প্রাসাদ ছিল নয় তলার। সেখানে দেখলাম অনেক ভিক্ষুই দালাইলামার সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় আছেন। আমরা যেখানে অবস্থান করছিলাম, সেখান থেকেই বাইরের দৃশ্য এত নয়নাভিরাম ছিল যে, তা বর্ণনারও অতীত। অবলোকন করছিলাম বিশাল কি চু উপত্যকা। তার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে এই শহর। শহরের চারপাশে যেন সবুজ উদ্যান। দেখা যাচ্ছে জো খাং মন্দিরের স্বর্ণচূড়া। আরও দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেরা ও দাবুং মঠ।
তাদের পেছনেই গাঢ় নীল পর্বতসারি। কিছুক্ষণ পর তিনজন লামা এসে হাজির হলেন। বললেন, দালাইলামা এখন মৃত মেরা তা লামার শেষকৃত্যের দায়িত্ব সারবেন। তিনি এ-ও বললেন, সেখানে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেয়া হয়েছে আমাদেরকে। খুবই ধীরে ধীরে হেঁটে আমরা অভ্যর্থনা কক্ষের মাঝে এসে দাঁড়ালাম। এই কক্ষের ছাদ ঠেকিয়ে রেখেছে তিন সারির স্তম্ভ। প্রত্যেক সারিতে চারটি করে স্তম্ভ।
এই কক্ষে থাকা আসবাবপত্র অন্যান্য লামা মঠেও দেখা যায়। কিন্তু পর্দায় ব্যবহার করা হয়েছে সবচেয়ে দামি রেশমি ও স্বর্ণালি কাপড়। পাত্রগুলো স্বর্ণের। দেওয়ালচিত্র যেন অনুপম রুচিশীলতার নিদর্শন। সিংহাসনের পেছনে সুন্দর পর্দা ঝোলানো। সাতিন কাপড়ের সামিয়ানা ওপরে। মেঝে খুব মসৃণ ও চকচকে। কিন্তু লাল রঙের দরজা ও জানালা সাধারণ মানের, যেমনটা পুরো তিব্বতে দেখা যায়। একজন ভৃত্য এলেন। আমাদের আনা উপহার খাতাগ (স্কার্ফ) নিয়ে গেলেন। তবে আমার সঙ্গীর পরামর্শে দালাইলামার জন্য আনা উপহার আমি নিজের কাছে রেখে দিলাম।
যখন আমি তার কাছে গেলাম, আমি ওই উপহার তার কোলে রাখলাম। আমার উপহার ছিল এক তোলা স্বর্ণের একটি টুকরা। সবাই ওই উপহার দেখে বিস্মিত হলেন। এরপর আমরা সবাই মেঝেয় পাতা কার্পেটে আসন গ্রহণ করলাম। মোট আটটি সারি ছিল। আমরা বসলাম তৃতীয় সারিতে। দালাইলামার সিংহাসন থেকে সামান্য বাঁ দিকে প্রায় ১০ ফুট দূরে আমাদের অবস্থান।
দালাইলামা হলেন ৮ বছরের বালক। উজ্জ্বল ফর্সা তার গায়ের রঙ। গাল কিছুটা লালচে। তার চোখ কিছুটা বড়। তার চেহারার আকৃতি অনেকটা আর্যদের মতো। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, দায়িত্ব ও তপস্বীতার কারণে তার শরীর বেশ চিকন। তার মাথায় হলুদ টুপি। তার নাকটাও ঢেকে গেছে মিত্রে নামে ওই বিশেষ টুপিতে। পুরো শরীর ঢেকে আছে তার হলুদ আচ্ছাদন। তিনি বসে আছেন আড়াআড়ি পা রেখে। যে সিংহাসনে তিনি বসে আছেন, তা ঠেকিয়ে রেখেছে সিংহের আকৃতির স্তম্ভ। পুরো আসন ঢেকে রাখা সিল্কের আচ্ছাদনে। চার ফুট উঁচু, ছয় ফুট লম্বা ও চার ফুট প্রস্থের এই সিংহাসন।
আশীর্বাদ গ্রহণ শেষে সবাই আসন গ্রহণ করলেন। একজন ভৃত্য দালাইলামার স্বর্ণালি কাপে চা ঢেলে দিলেন। চারজন সহকারী উপস্থিত সকলকে চা দিলেন। তারপরই কথা বলা শুরু করলেন দালাইলামা। ‘ওম, আহ, হুম’ এটি তিনবার পড়লেন তিনি। তারপর প্রার্থনা করলেন কিছুক্ষণ। তার প্রার্থণা শেষে আমরা নীরবে আমাদের কাপ তুললাম। চা খেলাম। এই চা ছিল খুবই সুস্বাদু ও সুঘ্রাণ মাখা। এভাবে আমরা মোট তিনবার চা খেলাম।
এরপর দালাইলামার সামনে সোনালি থালা রাখলেন ভৃত্য। থালায় শুধু ভাত। দালাইলামা এই থালা ছুঁয়ে দিলেন। তারপর এই ভাত উপস্থিত সবাইকে দেয়া হলো। এরপর তিনি আবার প্রার্থনা করলেন। তারপর তিনি খুবই নিচু স্বরে অস্ফুটভাবে প্রশস্তিবাক্য পাঠ করলেন। তার পুনরাবৃত্তি করলেন উপস্থিত লামারা। এসব শেষ হলে, প্রথম সারি থেকে একজন প্রবীণ দাঁড়ালেন। সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা রাখলেন। দালাইলামার অবদানের কথা কিছুক্ষণ বললেন। বক্তব্য শেষে তিনি দালাইলামাকে বেশকিছু মূল্যবান জিনিস উপহার হিসেবে দান করলেন। তারপর তিনি তার সামনে নত হলেন এবং বিদায় নিলেন। তার পিছু পিছু আমরাও বিদায় নিলাম।
আমি যখন বিদায় নিচ্ছিলাম, গৃহাধ্যক্ষের একজন সহকারী আমাকে দুই প্যাকেট বড়ি দিলেন। আরেকজন আমার গলায় লাল সিল্ক কাপড়ের টুকরা বেঁধে দিলেন। সকল পূণ্যার্থীই এই উপহার পেয়ে থাকেন।”
(লেখক শরৎ চন্দ্র দাস ছিলেন একজন ভাষাবিদ ও বৌদ্ধ ধর্ম বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। বৃটিশ গুপ্তচর হিসেবে তিনি দুইবার তিব্বত সফর করেন। এই সফরের প্রতিবেদন ছাড়াও, তিনি আধ্যাত্মিক ও গবেষণামূলক পুঞ্জিকা এবং তিব্বতি ভাষার অভিধান প্রকাশ করেন।)
এমটিনিউজ/এসএস