এক্সক্লুসিভ ডেস্ক: পুরস্কার নিতে গিয়েও রাষ্ট্রপতিকে হাসপাতালের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। সুবাসিনী মিস্ত্রির মুখোমুখি চৈতালি বিশ্বাস:
আপনার ছোটবেলা কোথায় কেটেছে? আর পড়াশোনা?
• দক্ষিণ ২৪ পরগনার কলুয়া গ্রামে। হরিদেবপুর থানা এলাকার মধ্যে পড়ে জায়গাটা। ওখানেই মা-বাবার সঙ্গে থাকতাম। পড়াশোনা শেখানোর মতো পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল না। ছোট বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। তারপর এলাম হাঁসপুকুর গ্রামে। স্বামী মাছ ধরতেন, কখনও চাষের কাজও করতেন। বাড়িঘর, জমিজমা এসব কিছুই ছিল না আমাদের।
স্বাবলম্বী ভাবে অর্থ উপার্জনের ভাবনা কেন?
• আমার চার সন্তান। ছোট ছেলের বয়স যখন সাড়ে চার, তখন আমার স্বামী মারা যান। বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছিলেন উনি। বাবাকে ছাড়া আমার সন্তানেরা অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছে! যখন উনি মারা যান, ঘরে মাত্র ৫৭ পয়সা রেখে গিয়েছিলেন। কী ভীষণ সংগ্রাম করে বাকি জীবনটা কাটিয়েছি, সে কথা শুধু আমিই জানি!
অসুস্থ স্বামীকে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাননি?
• ওখানেই তো বিনা চিকিৎসায় মারা যান তিনি! চিকিৎসায় অবহেলার কারণে! সামান্য ডিহাইড্রেশন থেকে! গরিব মানুষের কথা ভাবার জন্য কেউ নেই! ঘটনাটা আমায় গভীরভাবে আঘাত করেছিল। একইসঙ্গে ভাবিয়েছিল, বিনা পয়সায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল খোলা দরকার।
আপনার বয়স তখন কত? নিজে বাঁচলেন কীভাবে?
• (সামান্য বিষণ্ণতা। একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন) কত আর হবে, খুবই অল্প বয়স। ১৯৭১ সাল। চার ছেলেমেয়েকে নিয়ে হাবুডুবু খেয়েছি। টাকা রোজগারের জন্য এমন কোনও কাজ নেই যে, করিনি! লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ করা, চায়ের দোকানে কাজ, চাষের কাজ, ভেড়িতে পানা তোলা, ধাপার মাঠে কয়লা কুড়োনো— পয়সার জন্য সব করতে হয়েছে। রাস্তার ধারে হয়ে থাকা শাক তুলে এনে বিক্রি করতাম। সেখান থেকেই একদিন পেট চালানোর জন্য সব্জির ব্যবসা শুরু করলাম। ধাপার মাঠ থেকে পাইকারি রেটে সবজি তুলতাম। তা দিয়ে ঠেলা সাজিয়ে রাত ৩টেয় বেরিয়ে ঠেলে নিয়ে যেতাম তপসিয়া বাজারে, চার নম্বর ব্রিজের তলায়। সেসব বিক্রি করে দুপুরে আবার ঠেলা ঠেলে ফিরতাম। বাড়ি ফিরে রান্না, সংসারের কাজ। বিকেলে আবার সব্জি তুলতে যেতাম ধাপার মাঠ। কত ঘাম-রক্ত যে ঝরিয়েছি দু’টো পয়সার জন্য! আমার ছেলেমেয়েও সঙ্গে সঙ্গে কাজ করত। এর থেকেই কিছু কিছু করে পয়সা জমিয়েছিলাম। একদিন প্রায় এক বিঘা জমি কিনলাম। স্বামীর মৃত্যুটা সবসময় কাঁটার মতো বিঁধত যে! সেটাই হাসপাতাল গড়াল!
ছেলেমেয়েকে স্কুলে ভর্তি করাননি? পয়সার অভাবে?
• করেছি্লাম তো! মেয়েটা দু’তিন ক্লাস অবধি পড়ে ছেড়ে দিল। আমার সঙ্গে সব্জি বিক্রির কাজে লেগে গেল। বাকিরাও এখানে ওখানে কাজ করত। পরে অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দিই। কিন্তু খাওয়ার কষ্টে থাকতে না পেরে আমার বড় ছেলে চলে আসে। ছোট মেয়ে আর ছেলে ছিল মাধ্যমিক দেওয়া পর্যন্ত। আমি তো সারাদিন কাজ করি, ওদের দেখভাল করব কীভাবে! আর সব্জি বিক্রি করে তো হাজার হাজার টাকা রোজগার হয় না। কোনওদিন ৫০ টাকা লাভ তো কোনওদিন ২০ টাকা।
হাসপাতাল আপনি নিজে দেখাশোনা করেন?
• আমার বাড়ি থেকে ওটা এক কিলোমিটার দূরে হবে। তা-ও রোজ যাই। গরিবদের জন্য গড়া হাসপাতালে যাতে তাঁদের কোনও অসুবিধা না হয়।
হাসপাতাল তৈরির জন্য কোনওরকম সরকারি সাহায্য পেয়েছেন?
• আগে পাইনি। গ্রামের লোক, পাড়া-প্রতিবেশী যদি তখন সাহায্য না করতেন, হাসপাতাল গড়ে তোলা সম্ভব হতো না। সত্তর বছর বয়সে বাজার যাওয়া বন্ধ করেছি। এখন আমার ৭৭। আর পরিশ্রম করা সম্ভব নয়। এই হাসপাতালে ৪৫টা বেড। পয়সার অভাবে ভালভাবে কাজ করা যাচ্ছে না। তাই যাঁদের আর্থিক অবস্থা ভাল, এবার থেকে তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। যাতে গরিবদের বিনামূল্যে পরিষেবা দেওয়া যায়। রাষ্ট্রপতি ১০ হাজার টাকা দিলেন। আশা করছি, রাজ্য সরকারও এবার এই হাসপাতাল নিয়ে ভাববে।
রাষ্ট্রীয় সম্মান পেয়ে কেমন লাগছে আপনার?
• ভাল লাগছে! সকলেরই আনন্দ এতে। আপনি যদি খুশি হন, তাহলে এ আপনারও আনন্দ। শরীরটা একটু খারাপ। হাসপাতালে অবশ্যই আসবেন! এটার জন্যই তো আমার সবকিছু।-এবেলা
এমটিনিউজ২৪.কম/টিটি/পিএস