আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ‘আমার দিন শুরু হয় ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে। ঘুম থেকে উঠে স্বামী-সন্তান সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে নামাজ পড়ি, তারপর কম্পানিসংশ্লিষ্ট কিছু ই-মেইলের উত্তর দিয়ে গৃহস্থালির কাজে হাত দিই।’ নিজের গল্পটা এভাবেই শুরু করলেন ১৪ সন্তানের জননী তাম্মি আমবেল। যিনি ‘শেয়া তেরা অর্গানিকস’ নামে একটি সফল প্রসাধনী কম্পানি গড়ে তুলে যুক্তরাষ্ট্রে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে রীতিমতো আদর্শ উদাহরণ হয়ে উঠেছেন।
তাম্মি আমবেল বলেন, ‘আমি ভার্জিনিয়ার লেসবার্গে নিজের গড়া ফার্মেই পরিবার নিয়ে থাকি। প্রতিদিন সকালে আট সন্তানকে প্রস্তুত করে চার ঘণ্টা সময় দিই তাদের পড়ালেখার পেছনে। বাসায় আমিই তাদের ভাষাজ্ঞান, অঙ্ক—সব কিছু শেখাই। বাকি ছয় সন্তান কলেজে থেকে পড়ালেখা করে। বাচ্চাদের পড়িয়ে আমি চলে যাই কারখানায়। গাড়িতে ৩০ মিনিটের দূরত্ব। সেখানেই রাত পর্যন্ত সময় কাটিয়ে আবারও বাসায় ফিরি। তারপর পারিবারিক কাজ সেরে পাঁচ-ছয় ঘণ্টার জন্য ঘুমিয়ে পড়ি। ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে আবার উঠে যাই। আমার প্রতিটি দিন কাটে এভাবেই।’
৪৫ বছর বয়সী আমবেল স্কিন ও হেয়ার কেয়ারসহ নারীদের প্রয়োজনীয় নানা সৌন্দর্য পণ্য তৈরি করেন। যা তৈরি হয় শেয়া বাটার, ম্যায়োবি বাটার, ম্যারুলা অয়েলসহ আফ্রিকা থেকে আসা বিভিন্ন উপাদান থেকে। ২০০০ সালে কম্পানিটি শুরু করেন এক হাজার ৫০০ ডলারে। গত বছর এটি বিক্রি করেছে ২০ লাখ ডলারের পণ্য। মুনাফা এসেছে তিন লাখ ৫০ হাজার ডলার। শেয়া তেরায় বর্তমানে ১০ জন কর্মী কাজ করলেও নতুন পণ্য উদ্ভাবন, মার্কেটিং, প্যাকেজিং এবং বাজারজাতকরণসহ সব দিকেই সময় দেন আমবেল।
তাম্মি আমবেল বলেন, ‘মসজিদে গিয়েই আমি এ কম্পানি গড়ার আইডিয়া পাই। আফ্রিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি তারা সৌন্দর্যচর্চার জন্য মেহেদি, শেয়া বাটার, কালোজিরার তেলসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে। আমি এ জিনিসগুলোকেই আরো বড় বাজারে তুলে ধরতে চেয়েছি। কালোজিরার তেল এবং শেয়া বাটার বিক্রি শুরু করি অনলাইনে। প্রথম দিকে বিক্রি ভালো না হলেও ২০০১ সালে দেখতে পেলাম শেয়া বাটারের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে।
সৌদি আরবে আমার এক বন্ধুকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম, সে বলল এক মাসেই এক হাজার ডলারের শেয়া বাটার বিক্রি হয়েছে। তখন থেকেই বাজার বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে অনলাইনে এবং আমেরিকার ভিটামিন শপ স্টোরগুলোতে আমাদের ৩০০ পণ্য বিক্রি হয়।’ তিনি বলেন, ‘কম্পানিটি গড়ে তুলতে কোনো ধার নিইনি, ঋণ নিইনি কিংবা বিনিয়োগের জন্য অংশীদারও নিইনি। নিজের উপার্জিত অর্থই বারবার বিনিয়োগ করে আজ এখানে এসেছি।’
পণ্য তৈরির জন্য নতুন উপাদন খোঁজা এবং বিক্রেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আমবেল একাধিকবার সৌদি আরব ও আফ্রিকা ভ্রমণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি যখন কম্পানি শুরু করি, শপথ নিয়েছিলাম এমন কিছু করব না যাতে এ গ্রহটির কোনো ক্ষতি হয় এবং মানুষের জন্য সুযোগ তৈরি করব।
আমি ব্যবসায় অংশীদার হিসেবে তাদের নিয়েছি, যাদের প্রয়োজন রয়েছে এবং তারা সমাজের জন্য কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ব্যবসায় আমি এ নীতি অবলম্বন করে চলেছি। এ ছাড়া আমি আমার জমানো অর্থ থেকে প্রতিবছর ২.৫ শতাংশ দান করি।’
আমবেল বলেন, ‘আমার সন্তানের সংখ্যা ১৪। তাদের সবাই পাঁচ বছর বয়সী থেকে ২৭ বছর পর্যন্ত। তাদের মধ্যে ছয় সন্তান কলেজে থেকে পড়ালেখা করে। বাকি আট সন্তান ১০ একরের এই ফার্মে আমাদের সঙ্গে থাকে। তারা মুরগি, ভেড়া, মৌমাছি পালনে আমাকে সাহায্য করে।’
তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী ড. ইসহাকের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় ওয়াশিংটন ডিসির একটি মসজিদে। তিনি একজন নেফ্রলজিস্ট। পরিবারের সঙ্গে পাকিস্তান থেকে আমেরিকায় এসেছেন। আর আমি বড় হয়েছি ম্যারিল্যান্ডে একটি খ্রিস্টান পরিবারে। আমরা এসেছি জার্মানি থেকে। ম্যারিল্যান্ডে একাকী থাকা আমার মায়ের সঙ্গে আমি বেঁচে থাকার অনেক লড়াই করেছি, একসময় আমাদের ঘর ছিল না।
পারিবারিক নানা ঝামেলার কারণে অনেকবার আমাকে স্কুল পরিবর্তন করতে হয়েছে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে চাকরির খোঁজে বেরিয়ে যাই। বন্ধুদের সহায়তায় একটি অড চাকরি পেয়ে যাই। চাকরিস্থলেই একটি মুসলিম পরিবারের সঙ্গে আমাকে থাকতে হয়। তাদের দেখেই মূলত ইসলামে আকৃষ্ট হয়েছি। তারপর যত পড়েছি ততই বুঝেছি, ইসলামই সত্য।’
আমবেল এখন হিজাব পরেন। ফলে প্রতিবেশীদের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম তিনি। আমবেল বলেন, ‘আমার বর্তমান বাসস্থলের পুরো এলকায় সম্ভবত আমিই একমাত্র মুসলিম। প্রতিবেশীরা ভাবে আমি ইরান, সিরিয়া কিংবা পাকিস্তান থেকে এসেছি। অথচ একজন আমেরিকান মুসলিম হিসেবে আমি গর্ব অনুভব করি।’
ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি আশা করছি সন্তানরাও আমার পথ অনুসরণ করবে। তবে ক্যারিয়ারের ব্যাপারে তাদের চাপাচাপি করব না, নিজেদের পছন্দের পেশায় তারা যাবে। শুধু চাইব তারা পরিবেশ রক্ষায় কাজ করবে এবং প্রয়োজনে মানুষকে সাহায্য করবে।’ সিএনএন মানি।
এমটিনিউজ২৪.কম/টিটি/পিএস