এক্সক্লুসিভ ডেস্ক: ছয় বছর বয়সে একটি শিশু সাধারণত কী করে? সারাদিন খেলাধুলা, দুষ্টুমি কিংবা কার্টুন নিয়েই ব্যস্ত থাকে। মাঝে মাঝে একটু বই-খাতা নিয়ে নাড়াচাড়াও করে। এর বেশি কিছু সাধারণত ছয় বছরের একটি শিশুর থেকে কেউ প্রত্যাশা করে না। কিন্তু আদম মোহাম্মেদ আমের ছাড়িয়ে গেছে মানুষের কল্পনাশক্তির সকল সীমারেখাকেও। মাত্র ছয় বছর বয়সেই ককপিটে বসে বিমান চালিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছে এই শিশু। শুধু তাই নয়, বিমান পরিচালনা সংক্রান্ত আমেরের জ্ঞানের মাত্রা দেখে নিশ্চিতভাবেই চমকে যাবেন যেকোনো পাইলট। মাত্র প্রথম শ্রেণিতে পড়া মিশরীয়-মরক্কান শিশু আমের বিমান চালনার জ্ঞান দিয়ে মুগ্ধ করেছে সবাইকে। এতটাই মুগ্ধ করেছে যে, বিশ্বের অন্যতম বড় ও প্রসিদ্ধ এয়ারলাইন ইতিহাদ এয়ারওয়েজ আমেরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বিমান চালনার জন্য!
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের শেষের দিকে। মা-বাবার সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতেই থাকে আমের। আমিরাত থেকে ইতিহাদ এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে করে মরক্কো যাচ্ছিল আমেরের পরিবার। যাত্রাপথে ছোটবেলা থেকেই বিমানের প্রতি প্রবল আগ্রহী আমেরের বিমান পরিচালনা সংক্রান্ত জ্ঞানের পরিচয় পান বিমানটির এক ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট। এতটুকু একটি শিশুর মুখে নির্ভুলভাবে বিমান চালানোর খুঁটিনাটি শুনে, বিশেষ করে জরুরী অবতরণের সময় পাইলটকে কী করতে হয় তা শুনে ভীষণ অবাক হন সেই অ্যাটেনডেন্ট। মুগ্ধতা আর ভালো লাগা থেকেই বিমানটি মরক্কোতে অবতরণ করার পর বিমানের পাইলট ক্যাপ্টেন সামের ইয়াখলেফের কাছে আমেরকে নিয়ে যান তিনি। এরপর ক্যাপ্টেনের সামনেও নিজের জ্ঞানের প্রমাণ দেয় আমের। মাত্র ছয় বছরের একটি শিশুর মুখে এতকিছু শুনে নিজের বিস্ময় ধরে রাখতে পারেননি ক্যাপ্টেন, ককপিটেই ভিডিও করে সেটি ছড়িয়ে দেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ভিডিওতে বিমান চালনা সম্পর্কে আমেরের এমন জ্ঞান দেখে একইসাথে মুগ্ধ ও বিস্মিত হন সকলে।
ইউটিউবে পোস্ট করা ভিডিওটিতে দেখা যায়, জরুরী অবতরণের সময় (ইমারজেন্সি ল্যান্ডিং) পাইলটকে কী করতে হয়, সে বিষয়ে বুঝিয়ে বলছে আমের, ‘কিছু কিছু প্লেনে রাম এয়ার টারবাইন (বিমানের হাইড্রোলিক পাম্প কিংবা ইলেক্ট্রিকাল জেনারেটরের সাথে যুক্ত থাকে এমন ছোট টারবাইন, যেটি জরুরী মুহূর্তে জ্বালানির উৎস হিসেবে কাজ করে) থাকে। ইঞ্জিন অকার্যকর হয়ে গেলে এটি সিস্টেমকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। কিন্তু নো ইঞ্জিন পাওয়ারের কারণে ল্যান্ডিং গিয়ার ডোর (বিমানে সংযুক্ত এমন দরজা যেটি কি না ল্যান্ডিং গিয়ার প্রসারিত হওয়ার সময় খুলে যায়) তখন খুলবে না। তখন পাইলটকে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে হয়।’ ভিডিওতে আমেরকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘ভবিষ্যতে তোমার মতোই ক্যাপ্টেন হতে চাই’। জবাবে ক্যাপ্টেন সামেরও জানিয়ে দেন, ‘তোমার সঙ্গে বিমান চালাতে আর তর সইছে না আমার!’ আমেরের জ্ঞান ও পারদর্শিতায় ক্যাপ্টেন এতটাই মুগ্ধ হন যে, ইতিহাদ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ ছোট্ট আমেরকে আবুধাবিতে তাদের ট্রেনিং সেন্টারেই আমন্ত্রণ জানিয়ে বসে। শুধু তাই নয়, আমেরের যে এয়ারবাসটি সবচেয়ে পছন্দের, সেই এয়ারবাস এ৩৮০ চালানোর স্বপ্নও পূরণ করে তারা।
তবে সত্যিকার বিমান নয়, ইতিহাদ এয়ারওয়েজের কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত বিশেষ প্রশিক্ষণ মডিউল চালিয়েছে সে। ইতিহাদ কর্তৃপক্ষের আপলোডকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, স্বপ্ন পূরণের আনন্দে রোমাঞ্চিত আমের তার সহকারী পাইলটের উদ্দেশ্যে বলছে, ‘ক্লিয়ার ফর টেক-অফ, হেয়ার উই গো।’ এখানেই শেষ নয়, বিমান উড্ডয়নের প্রাক্কালে পাইলটরা যেমন যাত্রীদের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়ে থাকেন, আমেরও ঠিক সেরকমটাই করেছে, বলেছে, ‘লেডিস এন্ড জেন্টলম্যান, আবুধাবিতে সবাইকে স্বাগতম। ইতিহাদ এয়ারওয়েজকে বেছে নেয়ার জন্য ধন্যবাদ।’ প্রায় পাঁচ ঘণ্টার মতো পাইলটের অভিজ্ঞতা হওয়ার পর যারপরনাই খুশি ছোট্ট আমের। আমিরাতভিত্তিক পত্রিকা খালিজ টাইমসের কাছে নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বলেছে, ‘আমার জীবনের সেরা দিন ছিল এটি। ইঞ্জিন ফেইলার টেস্ট, গো অ্যারাউন্ড টেস্ট ও ট্রাফিক এলার্ট এভয়ডেন্স সিস্টেম টেস্টের অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার।’ আমেরের স্বপ্নপূরণের সাথী হতে পেরে বেজায় খুশি ইতিহাদ কর্তৃপক্ষও। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, ‘ককপিটে আমেরের সঙ্গে কথা বলে আমরা এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম, আমরা তাই চেয়েছিলাম ওর স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হোক। একদিনের জন্য সে ইতিহাদের পাইলট হয়ে গিয়েছিল এবং ওর সবচেয়ে পছন্দের এয়ারবাসটাই চালিয়েছে ও।’
কিন্তু মাত্র ছয় বছর বয়সেই বিমান চালনা সম্পর্কে এত জ্ঞান হলো কীভাবে আমেরের? আদমের বাবা মোহাম্মদ আমের জানাচ্ছেন, একদম ছোট বয়স থেকেই বিমানের প্রতি প্রবলভাবে আসক্ত তার ছেলে। খালিজ টাইমসের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘একদম ছোটবেলা থেকে কাগজ দিয়ে বিমান বানিয়ে এমনভাবে খেলা করত, যেন মনে হতো ও নিজেই বিমানটা চালাচ্ছে। কোন খেলনার দোকানে গেলে সবার আগে ওর চোখ যেত বিমানের দিকে।’ অবসর সময়ের বেশিরভাগটাই আমের বিমান চালনা সংক্রান্ত ডকুমেন্টারি দেখে, এভিয়েশন ম্যাগাজিন পড়ে ও অনলাইনে বিভিন্ন এয়ারক্রাফট সম্পর্কে পড়াশোনা করে পার করে, এমনটাও জানিয়েছেন আমেরের বাবা, ‘নতুন কিছু জানার প্রতি বরাবরই ওর ব্যাপক আগ্রহ। সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন করে সে। আমরা জানতাম, ওর জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত হতে দেয়ার জন্য ওকে প্রশ্ন করার ও জানার স্বাধীনতাটুকু দিতে হবে আমাদের।’
আমেরের বয়স যখন মাত্র নয় মাস, তখন থেকেই মা নাজাত এল হাথৌটের কাছে ইংরেজি শিক্ষা শুরু তার। প্রচুর ইংরেজি গল্প পড়ে শোনাতেন তিনি ছেলেকে, ফলাফল, মাত্র তিন বছর বয়সেই ইংরেজিত পড়া ও বলায় একেবারে পাকা হয়ে ওঠে আমের। নিজের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন সম্পর্কেও মুখ খুলেছে আমের, ‘বড় হয়ে যখন ক্যাপ্টেন হবো, আমার ইংরেজি শিক্ষক তখন আমার যাত্রী হবেন। তাঁকে নিয়ে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে যাব! আমেরিকা ঘুরতে চাই, উত্তর মেরুতে যেতে চাই, দক্ষিণ মেরুতেও যেতে চাই। সাত আসমান জুড়ে বিচরণ করতে চাই!’ ছেলের স্বপ্ন সম্পর্কে জানেন আমেরের বাবা-মাও। ছেলে একদিন নামকরা পাইলট হবে, সে বিষয়েও আত্মবিশ্বাসী আমেরের বাবা। তিনি তাই আশা প্রকাশ করেছেন, কোন বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আমেরকে উচ্চশিক্ষিত করার দায়িত্ব নেবে, যাতে সে বড় হয়ে মানবতার সেবা করতে পারে। তবে সে জন্য আমেরের মা-বাবার মতো আমেরকেও অপেক্ষা করতে হবে কিছুদিন।