বিনোদন ডেস্ক : বাংলা চলচ্চিত্রের এক ধূমকেতুর নাম সালমান শাহ। টেলিভিশন নাটক দিয়ে তার অভিনয় শুরু হলেও পরে তিনি চলচ্চিত্রে একজন জনপ্রিয় চিত্রনায়ক হয়ে ওঠেন। ১৯৯৩ সালে মুক্তি পায় তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’।
সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত এই ছবির মাধ্যমে চিত্রনায়িকা মৌসুমী ও গায়ক আগুনের অভিষেক হয়। বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় এই অভিনেতা সর্বমোট ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন, যার প্রায় প্রতিটি ছিল ব্যবসাসফল। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রহস্যজনকভাবে অকালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার তার ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী। তার এই মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করেছেন জনপ্রিয় তিন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী মৌসুমী, শাবনাজ, শাবনুর।
অভিনেত্রী মৌসুমী : সালমান আমার কাছের বন্ধুদের মধ্যে একজন। আমরা একসঙ্গে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করি। আমরা এত ভালো বন্ধু ছিলাম, কিন্তু ওর ২৭টি চলচ্চিত্রের মধ্যে মাত্র চারটি ছবিতে আমরা একসঙ্গে অভিনয় করেছি। তখন কোনো এক অজানা কারণে ওর সঙ্গে আমার ছবি করা হয়নি। তখন সালমান আর শাবনূরকে নিয়েই বেশি ছবি নির্মিত হয়েছে। তারপরও আমাদের বন্ধুত্ব এতটুকু কমেনি। আজও আমি যখন ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘অন্তরে অন্তরে’ ছবির কোনো গান টিভিতে দেখি, মনের অজান্তেই চোখের সামনে ভিড় করে সেই সময়ের স্মৃতি। সালমান, আজও আমি তোমায় ভুলিনি। তোমায় ভোলা কখনও সম্ভব নয়।
অভিনেত্রী শাবনাজ : সালমানের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অন্যরকম ছিল। সহকর্মী ছাড়াও আমাকে সে বড় ভাইয়ের স্ত্রী হিসেবে সম্মান করত। ‘ভাবি’ সম্বোধনে মিষ্টি মধুর তার ডাক আজও কানে বাজে। একসঙ্গে কাজ করতে করতে বন্ধুত্ব হয়। সর্বোপরি আমাদের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্কও ছিল। সালমান চলে যাওয়ায় আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে যে ক্ষতি হয়েছে তা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আরও সময় লাগবে। অসময়ে তার চলে যাওয়াটা মেনে নেওয়া একটু কঠিনই বটে।
সালমানের সঙ্গে ‘মায়ের অধিকার’, ‘আঞ্জুমান’ ও ‘আশা ভালবাসা’ ছবিতে কাজ করেছি। ছবিগুলোতে কাজের সুবাদে ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সালমানের সঙ্গে অনেক ভালো সময় কেটেছে। সারাক্ষণ ও দুষ্টুমিতে মেতে থাকত। দেশের বাইরে গেলে আমার জন্য তার উপহার আনা চাই-ই চাই। নাঈমকে বেশ পছন্দ করত। আমি উপহার পেলে নাঈমও পেত। তার সঙ্গে অনেক শেয়ারিংও ছিল। চলচ্চিত্র একটা পরিবার। পরিবারের সদস্যরা যেমন সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করেন, তেমনি আমরাও করতাম। কোনো কিছু খেলে ভাগাভাগি করে খেতাম- এসব এখন শুধুই স্মৃতি।
শিল্পী হিসেবেও সালমান ছিল অসাধারণ। অতি অল্প সময়ে চলচ্চিত্রাঙ্গনকে অনেক কিছু দিয়েছে সে। সবার বিপদে-আপদেও এগিয়ে আসত। চলচ্চিত্রে আমরা একটা পরিবর্তন এনেছিলাম। সালমান সেই গতিতে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। আমি চলচ্চিত্রাঙ্গন থেকে বিদায় নিলাম। সালমানও চলে গেল। তৈরি হলো এক ধরনের শূন্যতা।
আরও কিছুদিন যদি আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারতাম চলচ্চিত্রে, পরিবর্তনটা ধরে রাখা সম্ভব হতো। সালমান নেই, কিন্তু রেখে গেছে ভালো কিছু ছবি। সেই ছবিগুলোই সালমানকে আরও যুগ-যুগান্তর বাঁচিয়ে রাখবে ভক্তদের মাঝে।
অভিনেত্রী শাবনুর : দর্শকদের কাছে আজও বাংলা ছবির যুবরাজ সালমান শাহ্। আমি নিজেও সালমানের ভক্ত। তার ভক্ত হবো না-ই বা কেন? সালমান শুধু অভিনয়ে সেরা নয়, ব্যক্তি হিসেবেও অসাধারণ। যারা সালমানের সঙ্গে কাজ করেছেন বা তাকে কাছে থেকে দেখেছেন তারা জানেন। ওর সঙ্গে আমার প্রথম ছবি ‘তুমি আমার’।
এটি ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায়। এ ছবিতে কাজ করতে গিয়ে তাকে চিনেছি, জেনেছি, বুঝেছি। যদিও এর আগে এফডিসিতে প্রায়ই সালমানকে দেখতাম। সালমান আমাকে ছোট বোনের মতো দেখত। ওর ছোট বোন ছিল না বলেই ওর পরিবারে আমার আদরটা ছিল একটু বেশি। আমাকে পিচ্চি বলে ডাকত। সালমানের ডাকটা আজও আমার কানে বাজে- ‘এই পিচ্চি, এদিকে আয়।’
আমি যখন চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করি তখন আমার বয়স খুব বেশি ছিল না। পরিচালক যেভাবে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন, সেভাবেই কাজ করেছি। কার কাজটা ভালো হচ্ছে বা কে কেমন করছে, অত কিছু বুঝিনি। একের পর এক ছবিতে অভিনয় করলাম। সালমানের সঙ্গে বোঝাপড়াটাও বাড়ল। আমরা ১৪টি ছবিতে অভিনয় করেছিলাম। একদিন আমার মন ভীষণ খারাপ ছিল। গোমড়া মুখে সেটে বসে ছিলাম। সালমান জানতে চাইল, কী হয়েছে? আমি যখন কৌশলে এড়িয়ে গেলাম ও বুঝতে পারল মন খারাপের কারণ বলতে চাচ্ছি না।
এর পর শুরু হলো ওর পাগলামি। আমাকে নানা ধরনের গল্প আর এমনভাবে অঙ্গভঙ্গি করছে, যা দেখে না হেসে পারলাম না। এখনও মন খারাপ হলে সালমানের কথা মনে পড়ে- এই বুঝি সালমান এসে মনটা ভালো করে দেবে। কিন্তু এখন আর মন ভালো করতে কেউ আসে না।