বৃহস্পতিবার, ২৫ আগস্ট, ২০২২, ০১:২১:০৮

টাইটানিকের চেয়েও বিভীষিকাময় এই জাহাজডুবির ঘটনা

টাইটানিকের চেয়েও বিভীষিকাময় এই জাহাজডুবির ঘটনা

এক্সক্লুসিভ ডেস্ক: সময়টা ছিল ১৯৪৫ সাল। বাল্টিক সাগরের মাঝে যাত্রীবোঝাই জাহাজ তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার টর্পে'ডোর আ'ঘা'তে জাহাজটি মাঝসমুদ্রে ডুবে যায়। সমুদ্রের বরফজলে জমে মারা গিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ।

‘ভিলহেল্ম গাস্টলফ’ জাহাজডুবির ঘটনা আজও বি'ভী'ষি'কাময়। বলা ভালো, টাইটানিকের চেয়েও বি'ভী'ষিকাময় এই জাহাজডুবির ঘটনা। ‘টাইটানিক’। সেই সময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজ। এই জাহাজ দেখার জন্য বন্দরে ভিড় করেছেন মানুষ। 

১৯১২ সালে বিশ্ববাসীকে অবাক করে প্রথম যাত্রা শুরু করে ‘টাইটানিক’। কিন্তু এটাই যে তার শেষ যাত্রা হবে তা কে জানত। হিমবাহের সঙ্গে ধাক্কা লেগে সমুদ্রে ডুবে যায় জাহাজটি। এই দু'র্ঘ'টনায় মা'রা যান দেড় হাজার মানুষ।

তবে জাহাজডুবির এই ঘটনার তিন দশক পর বাল্টিক সাগরের বুকে আরও এক জাহাজডুবি ঘটে যা ‘টাইটানিক’-এর থেকেও বি'ভী'ষিকাময়। ‘ভিলহেল্ম গাস্টলফ’। ২০৮.৫ মিটার লম্বা ও ২৩.৫৯ মিটার চওড়া এই বিশাল জাহাজটি বিলোম অ্যান্ড ভস শিপইয়ার্ডের তরফে তৈরি করা হয়েছিল। 

এই জাহাজটি মূলত জার্মান নাৎসিদের একটি বিশেষ দলের বিনোদনের কথা ভেবে বানানো হয়েছিল। এই জাহাজটির নামকরণ হিটলারের নামে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও তা পরে সুইস শাখার নাৎসি দলনেতা ভিলহেল্মের নামে রাখা হয়। প্রায় ২৩ কোটি কেজি ওজনের এই জাহাজটি ১৯৩৮ সালে যাত্রা শুরু করে। 

৪০০ জন ক্রু সদস্য-সহ এই জাহাজটির মোট ১,৯০০ যাত্রী বহন করার ক্ষমতা ছিল। প্রথমে ক্রুজ জাহাজ হিসাবে এই জাহাজটি ব্যবহার করা হত। নাৎসি দলের সদস্যদের মধ্যে কেউ কোনও অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে এই ক্রু'জটি সেজে উঠত। 

শুধু তাই নয়, ১৯৩৮ সালের ১০ এপ্রিল এই জাহাজটি ভোটকেন্দ্র হিসাবেও ব্যবহৃত হয়েছিল। অস্ট্রিয়ার সংযোজন নিয়ে ইংল্যান্ডের জার্মান এবং অস্ট্রীয় নাগরিকেরা এই জাহাজেই ভোট দিতে এসেছিলেন। পরে জার্মান সেনাবাহিনীর পরিবহণকারী জাহাজ হিসাবে ব্যবহৃত হত ‘ভিলহেল্ম গাস্টলফ’। 

দ্বিতীয় বিশ্বযু'দ্ধ চলাকালীন নরওয়ে এবং বাল্টিক সাগরে এই জাহাজটিকে হাসপাতালে পরিণত করা হয়েছিল। ১৯৪০ সালের নভেম্বর মাস থেকে এই জাহাজটি পোল্যান্ডে ঠাঁই নিয়েছিল। দ্বিতীয় ডুবোজাহাজ প্রশিক্ষণ ডিভিশনের সেনাছাউনি হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল এই জাহাজ। 

পরিস্থিতি অনুযায়ী, বার বার নিজের ভূমিকা বদলেছিল এই সুবিশাল জাহাজ। ১৯৪৫ সালে এক ভ'য়া'নক দুর্ঘ'টনার মুখোমুখি হয় ‘ভিলহেল্ম গাস্টলফ’। বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় তখন নিজের নাম লিখতে শুরু করেছে ‘অপারেশন হ্যানিবল’। 

সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ার ভয়ে নিজেদের দেশ ছেড়ে অনেকে তখন একটি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। বন্দরে জাহাজের সারি। যাত্রীদের ভিড় উপচে পড়ছে। সেই সময় আবার নিজের ভূমিকা বদলে যাত্রীবাহী জাহাজে পরিণত হয় ভিলহেল্ম।

ঘোষণা করা হয়, যাত্রীদের নিয়ে রওনা হবে বলে ২৫ জানুয়ারি এই জাহাজটি বন্দরে এসেছে। প্রচারের চার দিনের মধ্যেই দেখা যায়, ৭,৯৫৬ জন যাত্রী নিজেদের নাম লিখিয়েছেন। যে জাহাজটি ২,০০০ যাত্রী বহনে সক্ষম, তাতে ওঠার টিকিট কেটেছিলেন তার প্রায় চার গুণ মানুষ!

৩০ জানুয়ারি দুপুরবেলা আনুমানিক ১০ হাজার যাত্রী নিয়ে জার্মানির ক্রিয়েগসমেরিন বেসের অন্তর্গত কিয়েলের উদ্দেশে রওনা হয়। জাহাজের প্রতিরক্ষার জন্য দুটি টর্পে'ডো বোট এবং আরও একটি ছোট জাহাজ যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। 

সেই ছোট জাহাজে সেনাবাহিনীর লোকজন থাকবে বলে ঠিক করা হয়। কিন্তু সেই ছোট জাহাজটিতে যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেয়। এ ছাড়াও একটি টর্পে'ডো বোটকে কোনও কারণে ফিরে যেতে হয়। অবশেষে একটি টর্পেডো বোট নিয়েই রওনা হয় ''ভিলহেল্ম গাস্টলফ''। 

দুপুর পেরিয়ে যত অন্ধকার বাড়তে থাকে, জাহাজের ক্যাপ্টেনের চিন্তাও বাড়তে থাকে শত্রু আ'ক্র'মণের। ক্যাপ্টেন ফ্রেডরিক পিটারসন নির্দেশ দেন, মাঝসমুদ্রে জাহাজ নিয়ে যেতে। এতে প্রাকৃতিক দুর্যো'গের আশ'ঙ্কা থাকলেও সোভিয়েত আ'ক্র'মণের হাত থেকে বাঁচা যাবে। 

জাহাজে যে সেনা কম্যান্ডার ছিলেন, তিনি ক্যাপ্টেনের এই নির্দেশে রাজি হননি। তার মত ছিল, জাহাজের সমস্ত আলো নিভিয়ে সৈকত বরাবর যাওয়া উচিত যাতে প্রাকৃতিক বি'প'র্যয়ের হাত থেকেও বাঁচা যায় এবং শ'ত্রুপক্ষও জাহাজের উপস্থিতি টের না পায়।

দুইজনের বাকবিত'ণ্ডা চলাকালীন পিটারসনকে জানানো হয়, জার্মানির একটি বি'স্ফো'রক অনুসন্ধানকারী জাহাজ তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। জাহাজের আলো না জ্বালালে দুই জাহাজের সং'ঘ'র্ষে ভ'য়ান'ক বি'প'দ ঘটতে পারে। বি'প'দ থেকে বাঁচতে আলো জ্বালানোর নির্দেশ দেন পিটারসন।

এই নির্দেশে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনেন পিটারসন। দূর থেকে যাকে জার্মানের বি'স্ফো'রক অনুসন্ধানকারী জাহাজ ভেবে আলো জ্বালানো হয়েছিল, তা আসলে ছিল রাশিয়ান এস-১৩ সাবমেরিন। আলো জ্বালিয়ে শ'ত্রুপক্ষের হাতে নিজে থেকেই ধ'রা দেয় ‘ভিলহেল্ম গাস্টলফ’।

সাবমেরিন থেকে পর পর তিনটি টর্পে'ডো জাহাজের দিকে ছোড়া হয়। তিনটির মধ্যে একটি জাহাজের নীচের দিকে কেবিনে, একটি সুইমিং পুল এলাকায় এবং শেষ টর্পে'ডোটি জাহাজের ইঞ্জিনে এসে লাগে। সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের আলো নিজে থেকেই নিভে যায়।

যাত্রীদের মধ্যে শোরগোল পড়ে যায়। প্রাণ বাঁচানোর জন্য সবাই ছোটাছুটি আরম্ভ করেন। অনেকে সেই ধাক্কায় মাটিতে পড়ে যান। কিন্তু যাত্রীরা তাদের উপর দিয়েই দৌড়ে যান। পদপিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মা'রা যান অনেকে।

সংঘর্ষের ফলে জাহাজটি এক দিকে ঝুঁ'কে পড়ে। তাই সে দিকে বাঁধা একটিও লাইফবোট জলে নামানোর মতো অবস্থায় ছিল না। শেষ পর্যন্ত ৯টি লাইফবোট জলে নামানো হলে তাতে ওঠার জন্য যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে মা'রপিট শুরু করে দেন।

অনেকে আবার পানিতে ঝাঁপ দেন সাঁতার কেটে নিজের প্রাণ বাঁচাবেন বলে। তখন জানুয়ারি মাসের কনকনে ঠান্ডা। বাল্টিক সাগরের জলের তাপমাত্রা -১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। বরফজলে ঝাঁপ দিতেই ঠান্ডায় জমে মা'রা যান অনেকে।

লাইফবোটে উঠবেন বলে অনেকে আবার লাইফবোটগুলিকে ঘেরাও করে ফেলেন। লাইফবোটের উপর থাকা যাত্রীদের পানিতে ফেলে তারা নিজেরা নৌকায় উঠবেন বলে একে অপরকে ধা'ক্কা দিতে শুরু করেন। প্রাণ বাঁচাতে দাঁড় দিয়ে মে'রে তাদের সরিয়ে দেন লাইফবোটের যাত্রীরা। 

এর ফলে অনেকেই ডুবে মা'রা যান। এই ঘটনার প্রায় ৪৫ মিনিট পর যাত্রীদের উদ্ধার করতে কয়েকটি জাহাজ ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়। কিন্তু পৌঁছনোর পর যে বী'ভ'ৎস দৃশ্য চোখে পড়ে তা দেখে সকলে আঁ'তকে ওঠেন। জাহাজের ধ্বং'সাবশেষ-সহ সমুদ্রে ভেসে রয়েছে সারি সারি মৃ'তদেহ।

১০ হাজার যাত্রীর মধ্যে মাত্র ১,২০০ জনকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করার সময় তাদের নজরে পড়ে একটি ছোট বাচ্চা লাইফবোটের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বাচ্চাটিকে উদ্ধার করে সেই উদ্ধারকারী দলের এক কর্মকর্তা তাকে দত্তক নেন।

জাহাজের মোট মহিলা যাত্রীর মধ্যে মাত্র তিন জন বেঁচে ছিলেন। যারা বেঁচেছিলেন তাদের মধ্যে এক জন জানান, জাহাজে এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা সপরিবারে যাত্রা করছিলেন। ঠান্ডা জলে ঝাঁপ দিয়ে জমে মা'রা যাওয়া অনেক বেশি কষ্টকর, তাই নিজের দুই সন্তানসহ স্ত্রীকে গু'লি করে মে'রে আ'ত্মঘা'তী হন।

পরে তদন্ত করে জানা যায়, রুশ সাবমেরিনের ক্যাপ্টেন মারিনেস্কো ম'ত্ত অবস্থায় কাজ করতেন। এই জন্য তার সম্মানহা'নিও হয়েছিল। তাই নিজের হারানো সম্মান ফিরে পেতে তিনি জাহাজ আ'ক্র'মণের নির্দে'শ দেন। 

তিনি ভেবেছিলেন, শ'ত্রুপক্ষকে আ'ক্র'মণ করেছেন বলে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। কোনও পুরস্কার তিনি পাননি। কিন্তু তার এই সিদ্ধান্ত যে কতটা ম'র্মা'ন্তিক, তার ভ'য়াব'হতা এখনও ইতিহাসের অ'ন্ধ'কার অধ্যায় হিসাবে রয়ে গিয়েছে। সূত্র: এবিপি

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে