শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৫, ১১:৩৬:৪৯

জানেন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী গ্রাম কোনটি?

জানেন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী গ্রাম কোনটি?

এক্সক্লুসিভ ডেস্ক : বিশ্বের অনেক মানুষের চোখে ভারতের বড় পরিচয়— অভাব-অনটন, অনাহার, বেকারত্ব আর ভিখারি। অনেকের দৃষ্টিতে এসবই ভারতের বড় পরিচয় বহন করছে। আবার কেউ কেউ ভারতকে এখনো গরিব দেশ হিসেবেই দেখে থাকেন। কিন্তু এই ভারতেই রয়েছে এমন এক গ্রাম, যা পুরো বিশ্বের কাছে এক বিস্ময়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার বড় অন্যতম হচ্ছে— ভারতের গুজরাটেই রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী গ্রাম মধপর।

গুজরাটের কচ্ছ জেলার অন্তর্গত মধপর গ্রাম সম্প্রতি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ ছড়িয়ে পড়া একটি তথ্যানুযায়ী, এই গ্রামের প্রায় ৯২ হাজার বাসিন্দার ব্যাংকে মোট ফিক্সড ডিপোজিটের পরিমাণ ছাড়িয়েছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

একবার ভাবুন তো? বিস্ময়কর ঘটনা। তবে অবাক হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই বিশাল অঙ্কের পাহাড়ের বড় কারণ হচ্ছে, তাদের রেমিট্যান্সের বহরে ধনী হয়েছে সেই গ্রাম।

মধপর গ্রামকে এত ধনী করে তুলেছে এক বিশেষ ইতিহাস। গ্রামের প্রায় ১২০০ পরিবার বিদেশে থাকে। বিশেষত আফ্রিকা মহাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে তারা। সেখানকার ব্যবসাবাণিজ্য, চাকরি ও উদ্যোক্তা কার্যকলাপ থেকে উপার্জিত অর্থ নিয়মিত রেমিট্যান্স হিসেবে পাঠানো হয় গ্রামে। ২০২৩ সালের বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট বলছে, ভারত মোট ১১১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে, যার বড় অংশই এসেছে গুজরাট থেকে। মধপর সেই সাফল্যের অন্যতম প্রতীক।

আর তাদের রয়েছে সাধারণ চেহারা, কিন্তু অসাধারণ শক্তি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি—এত অর্থনৈতিক শক্তি থাকার পরও মধপর গ্রামের বাড়িঘর বেশ সাধারণ মানের। চোখে পড়ে না বিলাসবহুল প্রাসাদ কিংবা অট্টালিকা। গ্রামবাসীর মতে, অর্থ জমিয়ে রাখা, শিক্ষা ও সামাজিক কাজে ব্যয় করাই শ্রেয়। এই ‘সংযমী’ মানসিকতা তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতার মূল কারণ।

সেই মধপর গ্রামে এখন ১৭টি ব্যাংক শাখা রয়েছে। এসবিআই, আইসিআইসিআই, এইচডিএফসি—সব বড় ব্যাংকই এখানে অফিস খুলেছে। ফলে মধপর আজ এক প্রকার অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেই পরিচিত।

শুধু অর্থ নয়, মধপরের গৌরব ইতিহাসেও জড়িয়ে আছে। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানি বিমান হামলায় ধ্বংস হয়েছিল ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি ঘাঁটি। তখন মধপর গ্রামের প্রায় ৩০০ নারী মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিমানবন্দরটি পুনর্নির্মাণ করেন। তাদের সেই অবদানই ভারতীয় সেনাকে পাল্টা আক্রমণে সহায়তা করেছিল। ২০১৫ সালে সেই স্মৃতিকে অমর করে রাখতে গ্রামে যুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে ভারত সরকার।

এ ছাড়া শিক্ষা ও আধুনিক সুবিধাও মধপর গ্রাম অগ্রগামী লাভ করেছে। ১৮৮৪ সালে ছেলেদের জন্য প্রথম সরকারি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯০০ সালে মেয়েদের স্কুলও গড়ে ওঠে। আজ এখানে আধুনিক হাসপাতাল, উন্নত রাস্তাঘাট, ব্যাংক শাখা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে গ্রামবাসী শুধু আর্থিক দিক থেকেই নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও উন্নত।

মধপর গ্রাম এখন শুধু শিক্ষা ও আধুনিকতায় নয়; রয়েছে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণ। আপনি যদি ভ্রমণপ্রিয় মানুষ হয়ে থাকেন, তবে মধপর আপনার জন্য বিশেষ গন্তব্য হতে পারে। এখানকার বাড়িঘর বাহ্যিকভাবে সাধারণ হলেও লুকিয়ে আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস ও অদ্ভুত আর্থিক শক্তি। ভুজ শহর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ গ্রাম সহজেই পৌঁছানো যায় গাড়ি কিংবা বাসে। মধপর গ্রাম ভারতের এক আশ্চর্য প্রতিচ্ছবি। যেখানে গ্রামীণ সরলতার আড়ালে লুকিয়ে আছে অগাধ ধনসম্পদ। অর্থনৈতিক শক্তি, ঐতিহাসিক অবদান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মিলনে এটি আজ বিশ্বের নজরে।

তাই যদি ব্যতিক্রমী ভ্রমণে ইচ্ছুক হোন, তাহলে মধপর আপনার তালিকায় রাখতেই পারেন। কে জানে এই গ্রামে পা রাখলে হয়তো আপনিও নতুন করে ভারতের অন্যরকম চেহারা দেখতে পাবেন।

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে