এক্সক্লুসিভ ডেস্ক : আকারে ছোট হলেও বিছানার কোণায় লুকিয়ে থাকা রক্তচোষা পরজীবী ছারপোকারা মানুষের রাতের ঘুম নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। তবে যে ছারপোকা মানুষদের অতিষ্ঠ করে তোলে এরা নিজেরা কোন জিনিসকে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়? এর প্রশ্নের উত্তর উঠে এল সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
গবেষণা বলছে, ছারপোকাদের সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ পানি।
ছারপোকা পানির সংস্পর্শে এলে কেমন আচরণ করে তা পর্যবেক্ষণ করেছেন ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড’-এর বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, এসব পরজীবী যতটা সম্ভব ভেজা জায়গা এড়িয়ে চলে। তবে বয়সে ছোট ছারপোকাগুলো বড়দের তুলনায় এ কাজে বেশি দক্ষ বা পটু।
বিজ্ঞানীদের এ গবেষণা কেবল মানুষের অন্যতম অস্বস্তিকর এ পরজীবী সম্পর্কে নতুন তথ্যই দিচ্ছে না, বরং ছারপোকা দমনের প্রচেষ্টাকে আরও উন্নত করতে সাহায্য করবে।
গেল ডিসেম্বরে গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘জার্নাল অফ ইথোলজি’তে।
গবেষণাপত্রে গবেষকরা লিখেছেন, “গবেষণার এসব ফলাফলে প্রমাণ মেলে, ছারপোকারা স্বভাবগতভাবেই ভেজা জায়গা এড়িয়ে চলে। ফলে তরল কীটনাশক তৈরির সময় ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে, যাতে ছারপোকা কীটনাশক দেওয়া ভেজা জায়গা থেকে পালিয়ে যেতে না পারে।”
আকস্মিক এক আবিষ্কার
বিজ্ঞানের অনেক বড় আবিষ্কারের মতোই এ গবেষণাটিও সম্পূর্ণ দুর্ঘটনাবশত বা হঠাৎ করেই হয়েছে।
কীটতত্ত্ববিদ ডং হওয়ান চো তার ল্যাবে বড় হওয়া ছারপোকাদের খাবার দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় তিনি খেয়াল করলেন, যে মেশিন দিয়ে ছারপোকাদের রক্ত খাওয়ানো হয় তা থেকে লিক হয়ে কিছু রক্ত ছাড়পোকাদের পাত্রে পড়ছে। পাত্রের ছারপোকাগুলো সেই ভেজা রক্ত থেকে বেশ দূরে সরে যাচ্ছিল।
এক বিবৃতিতে গবেষক চো বলেছেন, “লিক হওয়া রক্ত পাত্রের উপরের কাগজটিকে ধীরে ধীরে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। আমি ভেবেছিলাম ছারপোকাগুলো কাগজ থেকে রক্ত পেয়ে খুশি মনে তা পান করবে। তবে আমি দেখলাম একদম উল্টো। এরা রক্তের কারণে ভেজা কাগজের অংশটি সক্রিয়ভাবে এড়িয়ে চলছিল। ভেজা জায়গার আশপাশেও যাচ্ছিল না এরা।”
কৌতূহলী হয়ে গবেষক চো ও তার দল কিছু কাগজ পানি দিয়ে ভিজিয়ে পরীক্ষা করেন এবং সেখানেও ঠিক একই আচরণ দেখতে পান। এরপর তারা আরও বড় পরিসরে গবেষণা চালান ও খুব কাছ থেকে ছাড়পোকাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন।
গবেষকরা খতিয়ে দেখেছেন ছোট-বড় বা স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সব ধরনের ছারপোকা ভেজা ও শুকনো জায়গায় ঠিক কীভাবে চলাফেরা করে।
তারা বলছেন, ছারপোকাগুলো শুকনো জায়গার তুলনায় ভেজা জায়গায় অনেক কম সময় কাটায়। প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পানির সংস্পর্শে আসার আগেই ছারপোকারা ভেজা জায়গা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
তবে পূর্ণবয়স্কদের তুলনায় বাচ্চা ছারপোকা বা ‘নিম্ফ’ পানির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে প্রায় ৬০ শতাংশ পটু। ছোট ছারপোকাদের মধ্যে পানি এড়িয়ে চলার প্রবণতা বেশি প্রবল।
এ গবেষণা সম্ভবত ছারপোকাদের পানিকে ভয় পাওয়ার বিষয়ে প্রথম নথিবদ্ধ কোনো রিপোর্ট, যার পেছনে যৌক্তিক কারণ রয়েছে। এসব পরজীবী চ্যাপ্টা আকৃতির হয়। পানির শক্তিশালী আঠালো আস্তরণ এদের পেটে থাকা ‘স্পাইরাকল’ বা শ্বাসছিদ্রগুলো বন্ধ করে দিতে পারে।
এসব ছিদ্রগুলো দিয়েই এরা শ্বাস নেয়, যা অনেকটা মানুষের ফুসফুসের মতো কাজ করে। অন্য কথায়, সামান্য একটু পানিও এদের দম বন্ধ করে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
ছারপোকা দমনের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব কী?
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ছারপোকা প্রায় নির্মূল হয়ে গেলেও সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এরা আবার শক্তিশালীভাবে ফিরেছে। বর্তমানে এদের সংখ্যা কিছুটা স্থিতিশীল। তবে এরা ঘরের এক নাছোড়বান্দা শত্রু হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে ঘর থেকে এসব পোকাকে চিরতরে দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় খুঁজে বের করা জরুরি।
অন্যান্য গবেষণায় উঠে এসেছে, বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত কীটনাশকগুলোর বিরুদ্ধে ছারপোকাদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এখন কেবল রাসায়নিকের ওপর নির্ভর না করে আরও সমন্বিত দমন ব্যবস্থার প্রয়োজন।
এ নতুন গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, যারা ছারপোকা দমনের কাজ করেন তাদের তরল জাতীয় কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও সাবধান হওয়া উচিত।
গবেষক চো বলেছেন, “কীটনাশক যদি ছারপোকাকে সঙ্গে সঙ্গেই মেরে ফেলতে না পারে তবে এরা সেই ভেজা জায়গা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যাবে ও আবার ছড়িয়ে পড়বে।”