এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : ভাতের থালায় ধোঁয়া উঠছে, পাশে শর্ষে ইলিশ। ঘরজুড়ে একটা ঘ্রাণ, চেনা অথচ প্রতিবার নতুন লাগে। পরিবারের কেউ হয়তো বলেছেন, ‘এইটা আসল পদ্মার ইলিশ, খেয়ে দেখো কেমন তফাত।’ তুমি খেয়েছ। সত্যিই মনে হয়েছে অন্য রকম কিছু। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছ কি, একই প্রজাতির মাছ পদ্মা বা মেঘনায় ধরা পড়লে এমন অসাধারণ লাগে, অথচ সমুদ্রে বা অন্য নদীতে ধরা পড়া ইলিশে একই স্বাদ কি পাওয়া যায়?
উত্তর লুকিয়ে আছে পানির নিচের এক অদৃশ্য জগতে। প্ল্যাঙ্কটন নামের ক্ষুদ্র উদ্ভিদ আর প্রাণিকণার জগতে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের একদল গবেষক এই নিয়ে কাজ করেছিলেন বছর কয়েক আগে, ফলাফল প্রকাশ পেয়েছিল বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারের একটি লেখায়। তাঁদের গবেষণা বলছে, রহস্যটা মাছের গায়ে নয়, বরং সে কী খায় আর কোথায় খায়, তার মধ্যেই।
ইলিশ আসলে সমুদ্রের মাছ। সারা বছর সে ঘুরে বেড়ায় সাগরে। কিন্তু ডিম ছাড়ার সময় এলে শরীরে জাগে এক আশ্চর্য তাড়না। সে ফিরে আসে মিঠাপানিতে, নদীর দিকে। এই যাত্রা সহজ নয় মোটেও। স্রোতের বিপরীতে সাঁতরাতে হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তুমি যদি নদীর স্রোতের উল্টো দিকে সাঁতার কাটো, বুঝবে কতটা শক্তি লাগে এতে। ইলিশও তেমনই লড়ে এগোয়, আর এই লম্বা যাত্রায় তার দরকার হয় প্রচুর শক্তি। সেই শক্তির জোগান আসে খাবার থেকে।
এখানেই আসল ঘটনা। পদ্মা আর মেঘনার মোহনা অঞ্চলে প্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণ আর বৈচিত্র্য অন্য জায়গার চেয়ে ঢের বেশি। হিমালয়ের বরফগলা পানি আর দুই নদীর অববাহিকা থেকে বয়ে আসা পলিমাটি মিশে এখানকার পানিকে করে তুলেছে পুষ্টিতে ভরপুর। সেই পানিতেই জন্মায় অসংখ্য ক্ষুদ্র শৈবাল আর প্রাণিকণা, ইলিশের প্রিয় খাবার। মোহনার দিকে উঠে আসার পথে ইলিশ পেট ভরে খায় এসব, শরীরে জমতে থাকে চর্বি। এই চর্বিই স্বাদের আসল রহস্য। চর্বি যত বেশি জমে, মাংস তত নরম হয়। গন্ধটাও তখনই হয়ে ওঠে সেই চেনা, বিখ্যাত ইলিশের গন্ধ।
তুমি হয়তো ভাবছ, সবাই তো বলে ‘পদ্মার ইলিশ সেরা’, তাহলে মেঘনার কথা আসছে কেন এত করে? এখানে একটা মজার তথ্য আছে। গবেষকরা দেখেছেন, বাংলাদেশে যত ইলিশ ধরা পড়ে, তার ২ শতাংশের মতো আসে সরাসরি পদ্মা থেকে। সেগুলো আকারেও ছোট। দেশের বেশির ভাগ সুস্বাদু আর বড় ইলিশ আসলে ধরা পড়ে মেঘনার অববাহিকায়, বিশেষ করে চাঁদপুরের কাছাকাছি জায়গায়, যেখানে পদ্মা আর মেঘনা এসে মিশে যায়। বাজারে ‘পদ্মার ইলিশ’ নামে যা বিক্রি হয়, তার অনেকটাই আসলে মেঘনার মোহনা থেকে ধরা। শুধু নামের গুণে বিখ্যাত হয়ে গেছে পদ্মা। মৎস্য গবেষকদের একাংশ এমনও বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে দুই নদীর ইলিশের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। দুটোই একই বাস্তুতন্ত্রের অংশ।
তবে সব নদীর ইলিশ সমান নয়। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক সম্প্রতি মেঘনা আর তেঁতুলিয়া নদীর ইলিশ নিয়ে তুলনা করেছেন। তাঁদের অনুমান ছিল, প্ল্যাঙ্কটনের বৈচিত্র্যের কারণেই স্বাদে তফাত হতে পারে দুই নদীর মাছে। দেখা গেছে, তেঁতুলিয়ার ইলিশের স্বাদ কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেঘনার চেয়েও এগিয়ে। মানে শুধু নদীর নাম দিয়ে কিছু বোঝা যায় না। পানির গুণ, খাদ্যের বৈচিত্র্য, স্রোতের বেগ, এসব মিলিয়েই ঠিক হয় একটা এলাকার ইলিশ কতটা সুস্বাদু হবে।
সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। আগস্ট থেকে নভেম্বর, এ সময়ে ধরা পড়া ইলিশ পুষ্টি আর স্বাদ, দুদিক থেকেই সবচেয়ে ভালো বলে মনে করা হয়। কারণ, এ সময়েই ইলিশের শরীরে ডিমের প্রস্তুতি চলে, আর সেই প্রস্তুতির জন্যই চর্বি জমে সবচেয়ে বেশি। বর্ষার মাঝামাঝি, ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি যখন পড়ে অবিরাম, তখনকার ইলিশের স্বাদই নাকি সবচেয়ে খাঁটি। পুরোনো দিনের ভোজনরসিকেরা অন্তত তেমনই বলেন।
সমুদ্রের ইলিশের সঙ্গে নদীর ইলিশের তফাতটাও এখান থেকে বোঝা যায়। সাগরে থাকা অবস্থায় ইলিশের আশপাশে খাদ্যের জোগান তুলনামূলক কম। ফলে চর্বি কম জমে, স্বাদও কিছুটা সাদামাটা থেকে যায়। কিন্তু নদীতে ঢোকার পর, লোনাপানি থেকে মিঠাপানির দুনিয়ায় পা রাখার পর শরীরে শুরু হয় নীরব একটা বদল। চর্বি জমে, মাংস নরম হয়, স্বাদ তৈরি হতে থাকে ধীরে ধীরে।
পরেরবার থালায় ইলিশ পেলে হয়তো একবার ভেবো, মাছটা কোথা থেকে এসেছে। সমুদ্র থেকে হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে, স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতরে, নিজের শরীরে জমা করেছে যে স্বাদ, সেটা আসলে তার লড়াইয়েরই একটা চিহ্ন। প্ল্যাঙ্কটনের ভিড়ে, নদীর ঘোলা পানিতে, কারও চোখে না পড়া একটা যাত্রার শেষে তৈরি হয় সেই ভাত-ঢাকা থালার ইলিশ, যেটা তুমি এত দিন শুধু ‘স্বাদের মাছ’ বলেই চিনতে।