শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬, ০৯:৪১:৩১

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সম্পদের প্রাচুর্যই প্রকৃত সচ্ছলতা নয়; বরং প্রকৃত সচ্ছলতা হলো অন্তরের সচ্ছলতা’

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সম্পদের প্রাচুর্যই প্রকৃত সচ্ছলতা নয়; বরং প্রকৃত সচ্ছলতা হলো অন্তরের সচ্ছলতা’

শায়খ আহমাদুল্লাহ : শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য মানুষের মানবিক মূল্যবোধ ও চরিত্র গঠন করা। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা প্রায়ই দেখছি অনেক মানুষ উচ্চশিক্ষিত হলেও সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের মতো মৌলিক মানবিক গুণাবলি তাদের মধ্যে অনুপস্থিত।

সম্প্রতি মিরপুরে এক বৃদ্ধা মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যুর আলোচিত ঘটনাটি এর একটি বাস্তব উদাহরণ। অথচ তার প্রত্যেক সন্তানই উচ্চশিক্ষিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত।

মানবিকতা ও নৈতিকতার এ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ আমাদের বস্তুবাদী শিক্ষাব্যবস্থা। এই শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের যতটা ক্যারিয়ারমুখী ও ভোগবাদী হতে শেখায়, ততটা মানবিক হতে শেখায় না।

ফলে দিন, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও মানুষ হওয়ার শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে যত দিন আমরা শুধু বস্তুবাদ ও বৈষয়িক সফলতার পেছনে ছুটব, তত দিন এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আমাদের সমাজে ঘটতেই থাকবে।

এ ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী পিতা-মাতাও। কারণ আমরা অনেক সময় সন্তানদের অতিরিক্ত ক্যারিয়ারনির্ভর ও আত্মকেন্দ্রিক করে গড়ে তুলি। অথচ মনে রাখা দরকার, সন্তানদের যতই বৈষয়িকভাবে সচ্ছল করে তুলি না কেন, যদি দিন ও নৈতিকতার শিক্ষা তাদের না দিই, তবে তারা কখনও প্রকৃত মানুষ হয়ে বেড়ে উঠবে না। তারা হয়তো বিপুল সম্পদের মালিক হবে, কিন্তু প্রকৃত মানসিক প্রশান্তি লাভ করবে না।

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সম্পদের প্রাচুর্যই প্রকৃত সচ্ছলতা নয়; বরং প্রকৃত সচ্ছলতা হলো অন্তরের সচ্ছলতা’ (বুখারি)। যার অন্তর সচ্ছল ও পবিত্র, সেই প্রকৃত সচ্ছল মানুষ। কারো বাহ্যিক সচ্ছলতা না থাকলেও যদি তার অন্তর সচ্ছল হয়, তবে সে মানসিকভাবে অনেক বেশি সুখী ও প্রশান্ত থাকবে।

ইসলাম প্রতিটি মানুষকে অত্যন্ত দায়িত্বশীল হতে নির্দেশ করেছে।

প্রত্যেক মানুষই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন, সন্তান জিজ্ঞাসিত হবে পিতা-মাতার হক আদায়ের ব্যাপারে। স্বামী তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন, স্ত্রীও জিজ্ঞাসিত হবেন তার দায়িত্ব সম্পর্কে। এভাবে প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।

যখন প্রত্যেক দায়িত্বশীল নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবে, তখনই মূলত একটি সুন্দর পরিবার ও সমাজ বিনির্মিত হবে। নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন ও সততার গুণ অর্জনের জন্য কেবল উচ্চশিক্ষিত হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং এর জন্য দরকার দিন ও নৈতিক শিক্ষা। উচ্চশিক্ষা অর্জন করা অবশ্যই জরুরি; কিন্তু তার আগে মানবিক মূল্যবোধ, উত্তম চরিত্র, নৈতিকতা ও আল্লাহভীতির শিক্ষায় নিজেকে গড়ে তোলা অপরিহার্য। কারণ এসব গুণই মানুষকে প্রকৃত অর্থে মানুষ করে তোলে।

নয়তো শুধু উচ্চশিক্ষাই যদি মানুষ গড়ার জন্য যথেষ্ট হতো, তাহলে শিক্ষিত সন্তানদের হাতে পিতা-মাতা অবহেলিত হতেন না, বৃদ্ধাশ্রমগুলো পূর্ণ হতো না এবং সমাজে এত নৈতিক অবক্ষয়ও দেখা যেত না। প্রকৃত শিক্ষা সেই শিক্ষা, যা মানুষকে কেবল বৈষয়িক দক্ষতায় দক্ষ করে গড়ে তোলে না, বরং দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। তাই সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত বানানোর আগে প্রকৃত মানুষ হওয়ার পাঠ দেওয়া জরুরি।

মহান আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, ‘বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে’ (সুরা ফাতির)। অর্থাৎ প্রকৃত জ্ঞানী তারা যারা আল্লাহভীরু, সৎ ও বিনয়ী। আর যারা আল্লাহকে সর্বক্ষেত্রে ভয় করে তারা সব জায়গায় মানবিকতা ও সততার পরিচয় দেয়। একটি সুন্দর পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য মানবিক এবং তাকওয়াবান মানুষের বিকল্প নেই। অর্থাৎ এমন মানুষ, যারা অন্যের কষ্ট অনুভব করবে, সত্যকে ধারণ করবে, ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সাহসী হবে এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করবে। শিক্ষা তখনই সফল হবে, যখন তা মানুষের অন্তরে নৈতিকতা ও মানবিকতার আলো জ্বালাতে সক্ষম হবে।

অতএব আসুন, শিক্ষিত হওয়ার আগে প্রকৃত মানুষ হই। কারণ মানবিকতা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতায় সমৃদ্ধ শিক্ষাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। তাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি উত্তম চরিত্র, মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিক চেতনা গড়ে তোলা। তাহলেই আমরা সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত এবং প্রকৃত মানুষ হতে পারব।

♦ জুমার মিম্বর থেকে

গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে