এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : বছরজুড়েই ইলিশ মাছের দাম অনেকটাই বেশি! সাধারণত ইলিশের দাম অন্যান্য মাছ বা খাদ্যপণ্যের চেয়ে বেশি হয়, কিন্তু এবারে যেন অনেকটা নাগালের বাইরেই চলে যাওয়ার উপক্রম। ইলিশের মৌসুম শুরু হলেও দাম কমেনি। কেন এই পরিস্থিতি? এবছর কি আদৌ দাম কমবে?
ইলিশের বর্তমান দাম
ঢাকার কারওয়ান বাজারে এক কেজি ওজনের ইলিশ এখন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২৫০০–২৬০০ টাকায়। যদি মাছের ওজন এক কেজির বেশি হয়, তবে প্রতি কেজির দাম দাঁড়াচ্ছে ৩০০০–৩৫০০ টাকায়। আর এক কেজির কম হলে কেজিপ্রতি প্রায় ২০০০ টাকা।
পলাশী বাজারের ব্যবসায়ী প্রদীপ রাজবংশী জানান, গত সপ্তাহে তারা এক কেজি ইলিশ কিনেছেন ২০০০ টাকায়, আর এ সপ্তাহে দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২৫০–২৩00 টাকায়। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে দাম আরও বেশি হচ্ছে এবং বিক্রিও কমে যাচ্ছে।
চাঁদপুরেও একই অবস্থা। স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, সেখানেও এক কেজি ইলিশ ২৫০০ টাকার কাছাকাছি, আর দেড় কেজির বেশি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ৩০০০ টাকার উপরে বিক্রি হচ্ছে।
কেন এত দামি ইলিশ?
মূলত সরবরাহ কম থাকাই ইলিশের উচ্চ মূল্যের প্রধান কারণ। ভরা মৌসুমেও প্রত্যাশিত পরিমাণ মাছ ধরা যাচ্ছে না। উপরন্তু, প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও এখন ইলিশ আমদানি হচ্ছে না। সেখানে স্থানীয় বাজারে ইলিশের দাম তুলনামূলক কম হলেও বাংলাদেশের বাজারে সেই সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।
মৎস্য গবেষক মো: আনিছুর রহমান বলেন, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় জেলেরা মাছ ধরতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখে পড়েছেন। একের পর এক সতর্ক সংকেত থাকায় তারা সমুদ্রে যেতে পারছেন না, ফলে জাল ফেললেও আশানুরূপ মাছ ধরা যাচ্ছে না।
এছাড়া নদীর নাব্যতা সংকটও ইলিশের স্বাভাবিক গতিপথে বড় বাধা তৈরি করছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে পলি পড়ে ডুবোচর তৈরি হয়েছে, যা ইলিশের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দূষণ, জাটকা নিধন, নিষেধাজ্ঞার সময়েও মাছ ধরা এবং কারেন্ট জালের ব্যবহার—এসব কারণ মিলেই ইলিশের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২–২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন, কিন্তু ২০২৩–২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টনে। অথচ বাজারে চাহিদা বরং বেড়েছে, বিশেষ করে অনলাইনে বিক্রির কারণে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়ছে।
আরেকটি দিক হলো ব্যয় বৃদ্ধি। বড় ট্রলার চালাতে এখন যে খরচ হয়, তা আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আগে যেখানে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় সমুদ্রে মাছ ধরা যেত, এখন লাগে ৪–৫ লাখ টাকা। এর প্রভাবও সরাসরি পড়ছে ইলিশের দামে।
দাম কি শিগগিরই কমবে?
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সেপ্টেম্বর–অক্টোবরই ইলিশের মূল মৌসুম। তখন আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ধরা পড়তে পারে বেশি মাছ। গবেষক আনিছুর রহমান বলছেন, মৌসুমের শুরুর দিকে পূর্ণিমার সময় যদি আবহাওয়া ভালো থাকে, তাহলে একেকটা জালে আগের তুলনায় দ্বিগুণ–তিনগুণ ইলিশ ধরা সম্ভব।
চাঁদপুর বনিক সমিতির সভাপতি আবদুল বারী জমাদার জানান, সরবরাহ বাড়লেই দুই-তিন দিনের মধ্যে দাম কমে যায়, কখনো কখনো কেজিপ্রতি ৪০০–৫০০ টাকা পর্যন্ত।
মৎস্য অধিদফতরের কর্মকর্তারাও আশাবাদী। তাদের ধারণা, সেপ্টেম্বরে ভালো পরিমাণ মাছ পাওয়া গেলে ঘাট পর্যায়ে এক কেজির ইলিশ ১৮০০ টাকায় নামতে পারে।
সমাধান কীভাবে সম্ভব?
তবে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা সমাধান সহজ নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, নদীর নাব্যতা সংকট—সব মিলিয়ে ইলিশের প্রজননক্ষেত্র হুমকির মুখে। মৎস্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে নাব্যতার সমস্যা শনাক্ত করে ম্যাপিং করা হয়েছে এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় উদ্যোগে ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মকর্তাদের আশা, এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে ৩–৫ বছরের মধ্যে ইলিশের স্বাভাবিক আবাসস্থল পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। তবে বাস্তবে নানা পরিকল্পনা থাকলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
জাতীয় মাছ হিসেবে ইলিশ শুধু সংস্কৃতির অংশ নয়, অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সঠিক পদক্ষেপ না নিলে এর দাম মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।