এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন দলের অন্যান্য নেতাদের মতো ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গা ঢাকা দেন। টানা আট মাস তিনি দেশেই নানা জায়গায় পালিয়ে ছিলেন। বারবার জায়গা বদল করেছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জানান। বর্তমানে তিনি সেখানেই আছেন।
সম্প্রতি সাংবাদিক সুলতানা রহমানের সঙ্গে ভার্চুয়াল টক শোতে অংশ নিয়ে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই তুলে ধরেছেন পুরো বিবরণ। জানিয়েছেন কীভাবে কার সহযোগিতায় পালিয়ে ছিলেন এবং বর্তমানে কোথায় আছেন। এছাড়াও আওয়ামী লীগ সরকারে পতনের নানা দিকও তিনি বিশ্লেষণ করেন।
সাবেক কূটনীতিক ড. একে আব্দুল মোমেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের ছোট ভাই। ২০১৮ সালে তিনি বড় ভাইয়ের আসন সিলেট-১ থেকে আওয়ামী লীগের টিকিটে বিজয়ী হন এবং শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হলেও মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয়নি।
ড. মোমেন জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিদের মতো তিনিও আত্মগোপনে চলে যান। এরপর দেশের ভেতরেই পালিয়ে ছিলেন আট মাস। ধরা পড়ার ভয়ে একাধিকবার বাসা বদল করেছেন। মোবাইল ফোনের সিম বদলিয়েছেন ছয়বার। চেহারায়ও এসেছে আমূল পরিবর্তন। দাড়ি রাখায় তাকে চেনাও দায়। এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আছেন।
সাবেক এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তার স্ত্রীই যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। পালিয়ে থাকা এবং দেশ ছাড়ার ব্যাপারে তিনি সরকারের লোকদের সহযোগিতা পেয়েছেন। তিনি বিমানবন্দর দিয়ে দেশ ছাড়েননি জানালেও কোন পথে দেশ ছেড়েছেন সে ব্যাপারে কিছু বলেননি।
একে মোমেন জানান, গণঅভ্যুত্থানের পূর্ববর্তী সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই ছিলেন। সেখান থেকে কয়েক দিন আগে দেশে ফিরেন। আর তিনি আসার পরপরই গণঅভ্যুত্থান হয়। ফলে তাকেও অন্যদের মতো আত্মগোপনে যেতে হয়েছে।
পালিয়ে থাকার কাহিনি তুলে তিনি বলেন- এটা একটা সিনেমা হতে পারে। সুন্দর মুভি হবে। আই ওয়াজ দ্য লাস্টম্যান টু লিভ দ্য কান্ট্রি। আমি কোনো অন্যায় করিনি। কাউকে কোনোদিন জেলে পাঠাইনি। কোনো চুরি-চামারি করিনি। সো আই ওয়াজ কনফিডেন্ট। আমি কেন পালাবো? কিন্তু যখন কর্নেল সাব আমাকে ফোন করে বললেন; স্যার উই উইল প্রটেক্ট ইউ। তখন আমার সবাই বললো- স্যার আপনার নাম্বার পেয়ে গেছে। এখান থেকে পালান।’
কীভাবে কোথায় পালিয়ে ছিলেন সেটা তুলে ধরে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, আমি কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাইনি। আমার সব আত্মীয়-স্বজন পাবলিকলি নোন। আমি অন্যান্য লোকের যেমন রেন্ট হাউসের বাড়িতে ছিলাম। এইটা আমার খুব কাজ দিয়েছে। এক বাসার মালিকের সঙ্গে দেখা হয়েছিলো।
সেই মালিককে আমি জিজ্ঞেস করলাম; আপনার এগুলো তো সুন্দর। উনাকে আমি আগে চিনতাম। উনি এসে বললেন; আমরা গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। হোটেলে আমাদের বায়ারকে রাখি না। বাসায় রাখি। এজন্য বাসা সুন্দর করে রাখি। এখন যেহেতু দেশে কোনো বায়ার আসতেছে না, কেউ আসলে সিঙ্গাপুর কিংবা ব্যাংকক পর্যন্ত আসে। ঢাকায় ভয় পায় আসে না। সেজন্য সব খালি। তার জন্য আপনি ভাড়া পাচ্ছেন।
ড. মোমেন বলেন, আমি পালিয়ে পালিয়ে ছিলাম। যাতে বাইরে কেউ না চিনতে পারে, মবের জ্বালায়। সেজন্য চেহারা-টেহারা সব পরিবর্তন করে ফেলেছি। যখন নাপিতের কাছে গেলাম, এক বাসায় গেলাম সার্টেন টাইমে। ওই বাসায় এক নাপিত এলো। সেটি আমার বাসা না। আরেকজনের বাড়িতে। যাতে ওই নাপিত কাউকে বলতে পারে না কোথায় আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে। এটা লং স্টোরি। বহুত কষ্ট করে বের হয়েছি।
আমার বউয়ের প্রেসারে ও উনার বুদ্ধিতে বের হয়েছি। এই যে বের হইছি কিছু জানি না। কারণ আমি তো ফোনে কথা বলতে পারি না। সি মেক দিস এরেঞ্জমেন্ট। দেশে অনেক ফড়িয়া আছে আপনাকে বিদেশ পাঠানোর জন্য। ওগুলো সবগুলোই মানি মেকিং। শুধু টাকা নেয়। আমি জীবিত আছি। আর মানুষের দোয়া। বহু লোক আমার জন্য দোয়া করেছে। ওমরাহ্ হজ করেছে। আমি তো অনেককেই চিনি না। বাট ডিড ইট।
অন্তর্বতী সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশটাকে বাঁচাতে হবে। দেশটাকে জঙ্গি দেশ বানাতে চাই না। এ ব্যাপারে সবার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
এ সময় তিনি শেখ হাসিনা সরকারের পতনের কারণ নিয়েও বিশ্লেষণ করেন। এই পতনের পেছনে বিদেশি শক্তির হাত আছে বলে ইঙ্গিত দেন। তিনি নানা সময় সরকারকে সতর্ক করেছেন বলেও জানান।