আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানে চলমান সরকার পতনের আন্দোলনে সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘাতের জেরে দেশটিতে অবস্থিত নিজেদের দূতাবাস সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে যুক্তরাজ্য। সেইসঙ্গে নিজেদের নাগরিকদের ইরানে ভ্রমণের ব্যাপারে সতর্কতাও জারি করেছে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতির মাধ্যমে এ তথ্য জানা গেছে। খবর বিবিসির।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ইরানে যুক্তরাজ্যের দূতাবাসের সব কর্মকর্তা ও কর্মীকে সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলে ফের স্বাভাবিকভাবে দূতাবাস চলবে। তার আগ পর্যন্ত দূর থেকে দূতাবাস পরিচালনা করা হবে।
নাগরিকদের ভ্রমণ সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে ব্রিটিশ নাগরিকদের আপাতত ইরানে ভ্রমণ না করার আহ্বান জানাচ্ছে সরকার; যেসব নাগরিক বর্তমানে ইরানে অবস্থান করছেন, তাদের উদ্দেশে বলা হচ্ছে— আপনারা যে যেখানেই আছেন, নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সর্বদা সজাগ থাকবেন এবং ঝুঁকি এড়িয়ে চলবেন।
উল্লেখ্য, দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ব্যাপক আকারে সরকার পতনের আন্দোলন চলছে ইরানে। দিন যতো গড়াচ্ছে, আন্দোলনের মাত্রাও ততো তীব্র হচ্ছে।
বড় ধরনের এ আন্দোলন-বিক্ষোভ ওঠার প্রাথমিক কারণ দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতি। বছরের পর বছর ধরে অবমূল্যায়নের জেরে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়েল বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রার স্বীকৃতি পেয়েছে। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়েলের মান ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫। অর্থাৎ ইরানে এখন এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়েল।
জাতীয় মুদ্রার এই দুরাবস্থার ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি চলছে ইরানে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন ইরানের সাধারণ জনগণ।
এই পরিস্থিতিতে গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। সেই ধর্মঘট থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত।
এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সবগুলো শহর-গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ এবং দিনকে দিন বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়তে থাকে। বিক্ষোভ চলাকালে ইরানের বিভিন্ন সরকারি ভবনে আগুন লাগিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। এমনকি ইরানের জাতীয় পতাকাও ছিঁড়ে ফেলতে দেখা যায় বিক্ষোভে। সরকার পতনের ডাক দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুও চাওয়া হয় বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে।
এ অবস্থায় বিক্ষোভরত জনতাকে ‘আল্লাহর শত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করে ইরানের ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকার। তেহরান বারবার দাবি করে আসছে, এ বিক্ষোভের পেছনে সরাসরি মদদ আছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদও ইরানের এ বিক্ষোভে নিজেদের হাত থাকার কথা স্বীকার করেছে।
বিক্ষোভ দমনে ইতোমধ্যে ইন্টারনেট-মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়েছে ইরান, সেইসঙ্গে দেশজুড়ে পুলিশ-নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনীকে। জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সংঘাতে ইতোমধ্যে ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে দাবি করছে পশ্চিমা বিভিন্ন মিডিয়া ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো।