এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : বিএনপির আপসহীন ভূমিকার কারণে ষড়যন্ত্র কিংবা অপপ্রচার চালিয়ে এই দলকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় তিনি বলেন, ‘কৌশলের নামে গুপ্ত কিংবা সুপ্ত বেশ ধারণ করেননি বিএনপির কর্মীরা।’
গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম-খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান এ কথা বলেন। ‘মায়ের ডাক’ ও ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর যৌথ উদ্যোগে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। অনেক সন্তান তার বাবা, অনেক মা তার ছেলে, অনেক স্ত্রী তার স্বামীর ছবি নিয়ে আসেন। শুরুতেই তারেক রহমান সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এ সময় বিএনপি চেয়ারম্যানকে কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। কেউ কেউ হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে তারেক রহমানকে জড়িয়ে ধরেন। তারেক রহমানও এ সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। অশ্রুসিক্ত স্বজনদের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন তিনি। এ সময় গুম-খুন হওয়া পরিবারের স্বজনদের আহাজারিতে সম্মেলন কেন্দ্রে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
তারেক রহমান বলেন, ‘দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা কখনো কখনো হয়তো কিছুটা স্তিমিত হয়েছে, কিংবা আন্দোলন কখনো তুঙ্গে উঠেছে। আর এই আন্দোলন করতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য গুম-খুন-অপহরণ-মিথ্যা মামলার হয়রানি, নির্যাতনের পরও বিএনপির একজন নেতাকর্মীও রাজপথ ছাড়েননি। পরিবারের এক ভাই গুম হয়েছেন, আরেক ভাই গিয়ে তার জায়গায় পরের দিন রাজপথের আন্দোলনকে আরও তীব্র করার শপথ নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। কৌশলের নামে গুপ্ত কিংবা সুপ্ত বেশ ধারণ করেননি বিএনপির কর্মীরা।’
তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যে দলের নেতাকর্মীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে এ ধরনের আপসহীন ভূমিকা রাখতে পারে; সেই দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কিংবা অপপ্রচার চালিয়ে কেউ দমন করে রাখতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ।’
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যারা গুম ও শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি আগামীদিনের গণতান্ত্রিক যে রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা; আমরা দেখছি সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সরকারের অবশ্যই অনেক দায় ও দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্র কখনোই আপনাদের ভুলে যেতে পারে না। সব শহীদের আত্মত্যাগকে জনমনে স্মরণীয় করে রাখতে আগামীদিনে বিএনপি কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাধকতার কারণে এই মুহূর্তে আমি হয়তো বিস্তারিতভাবে সেই পরিকল্পনা তুলে ধরতে পারছি না। কিন্তু তারপরও বলতে যদিও কষ্ট হচ্ছে যে, আমরা দেখেছি, নির্বাচন কমিশনের রিসেন্টলি কিছু বিতর্কিত ভূমিকা বা বিতর্কিত অবস্থান। তারপরও একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা ধৈর্যের পরিচয় দিতে চাই।’
দলীয় নেতাকর্মীদের সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘স্বাধীনতাপ্রিয়, গণতন্ত্রপ্রিয় প্রতিটি মানুষের সামনে জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ এসেছে। কেউ কেউ বিভিন্ন কথা বলে একটি অবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে, যেখানে এই গণতন্ত্রের যে পথ তৈরি হয়েছে, সেটি যাতে বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের দল-মত নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাদের সজাগ থাকার জন্য অনুরোধ করব; যারা বিভিন্ন উসিলা দিয়ে বিতর্ক তৈরি করে গণতন্ত্রের পথকে আবার নষ্ট করার বা ব্যাহত করার চেষ্টা করছেন, তারা যাতে সফল না হয়।’
অতীতের সব অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করতে আগামীতে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা জরুরি মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘এবার যদি আমরা একটি দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সরকার গঠনের সুযোগ হাতছাড়া করি, তাহলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আমাদের যে শহীদ—সেই শহীদদের প্রতি জুলুম করা হবে, তাদের আত্মত্যাগের প্রতি অমর্যাদা করা হবে। ’৭১ সালে যারা শহীদ হয়েছেন এ দেশকে স্বাধীন করার জন্য, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, বিগত ১৬ বছরে যারা গুম-শহীদ হয়েছেন, বিভিন্নভাবে নির্যাতিত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, ২৪ সালের ৫ আগস্টের আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, হাজারো মানুষ যারা বিভিন্নভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন; প্রতিটি অন্যায়ের বিচার যদি প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, তাহলে আগামীদিনে অবশ্যই বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রয়োজন।’
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘আপনারা যারা আজকে এখানে বসে আছেন, এখানে উপস্থিত হয়েছেন শত কষ্ট বুকে নিয়ে এই মানুষগুলো যাতে দেশের আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচার পেতে পারে, তার একমাত্র উপায় হচ্ছে বাংলাদেশে আগামীদিনে অবশ্যই একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত করা। যে সরকার জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে কাজ করবে, যারা নির্যাতিত-অত্যাচারিত হয়েছেন, তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করবে।’
দীর্ঘদিনের আন্দোলন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘আমাকে বাধ্য হয়ে বহু বছর দেশ, স্বজন ও মানুষ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। দূর থেকে যতটুকু সম্ভব হয়েছে, আমার নেতাকর্মী যারা আছেন, নেতাকর্মীর বাইরেও এই স্বজনহারা মানুষ সারা দেশে যারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন, দলীয় অবস্থান থেকে আমরা চেষ্টা করেছি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে সরব উপস্থিতি রাখতে, প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলতে। ঠিক একইভাবে আমরা সেই সময় যতটুকু আমাদের সাধ্য ও সামর্থ্য ছিল, তা দিয়ে আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের এই স্বজনহারা মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে। আমরা কতটুকু পেরেছি, কতটুকু পারিনি, সেটির জবাব ভিন্ন। তবে এতটুকু আপনাদের সামনে বলতে পারি, আমাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি ছিল না। হয়তো সীমাবদ্ধতা ছিল, সীমাবদ্ধতা আছে এখনো প্রতিটি মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর। তবুও আমরা আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি এবং ইনশাআল্লাহ আমাদের এই চেষ্টা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা করা হয়েছে। হাজারের মতো নেতাকর্মীকে হতে হয়েছে গুমের শিকার, যাদের কিছু পরিবার আজ এখানে হাজির আছে। সারা দেশে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় শুধু বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেড় লাখের বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। যার বোঝা প্রায় ৬০ লাখের মতো নেতাকর্মীকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে। এর মধ্যে লাখ লাখ নেতাকর্মী বছরের পর বছর, মাসের পর মাস, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, দিনের পর দিন ঘরবাড়ি ছাড়া থাকতে হয়েছে, স্বজনহারা থাকতে হয়েছে, স্বজন থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। এসব মামলার সবই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘গুম-খুনের সেই বিভীষিকাময় দিন বা রাতের অবসান হয়েছে। বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। যেসব মানুষ তাদের স্বজন হারিয়েছেন, যেসব মায়েরা তাদের সন্তান হারিয়েছেন, যেসব বোনেরা তাদের স্বামীকে হারিয়েছেন, যেসব সন্তান তাদের পিতাকে হারিয়েছে; তাদের যদি বলতে হয়—আসলে আপনাদের সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা বোধহয় আমাদের কাছে নেই। এক দুঃসহ সময় আমরা অতিক্রম করেছি। এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আজ কয়েকজন সন্তান তার কষ্টের কথাটি উল্লেখ করে গেছে। যে সন্তান এক দিনের জন্যও তার পিতাকে বা পিতার মুখ দেখার সুযোগ পায়নি, তেমন সন্তান আজ আমাদের মধ্যেই উপস্থিত আছে। আমরা জানি না, একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জানেন সেই সন্তান তার পিতাকে আবার কোনোদিন দেখবে কি না। অনেক সন্তান এখনো অপেক্ষায় আছে।’
‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনের সভাপতিত্বে এবং মায়ের ডাক’-এর সংগঠক সানজিদা ইসলাম তুলি, ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্য সচিব কৃষিবিদ মোকছেদুল মোমিন মিথুন ও সদস্য জাহিদুল ইসলাম রনির যৌথ সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় গুম থেকে ফিরে আসা দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন নিজেদের কথাও তুলে ধরেন। অন্যদিকে গুমের শিকার কাউসারের মেয়ে লামিয়া আক্তার মিম, পারভেজের মেয়ে হৃদি, সোহেলের মেয়ে সাফা, এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী তাহসিনা রুশদীর লুনাসহ আরও কয়েকটি পরিবারের সদস্যরাও জানান তাদের বেদনা ও কষ্টের কথা।
তারা জানান, বিগত দিনে বাসা-অফিস বা রাস্তা থেকে তাদের স্বজনদের তুলে নেওয়া হয়েছে। স্বজনদের খোঁজে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে তারা যাননি। স্বজনদের শেষ পরিণতি কী হয়েছে, তা তারা জানেন না। স্বজনহারাদের প্রত্যাশা, তারেক রহমান যেন তাদের পাশে থাকেন। এ ছাড়া গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারও দাবি করেন স্বজনরা।
অনুষ্ঠানে স্বজন হারানো সদস্যরা যখন তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা বলছিলেন, তখন মঞ্চে থাকা তারেক রহমান অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। বারবার তাকে চোখ মুছতে দেখা যায়। এ সময় মঞ্চে থাকা সালাহউদ্দিন আহমদসহ অন্যরাও হয়ে পড়েন অশ্রুসিক্ত। মতবিনিময় সভায় ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর প্রধান উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, উপদেষ্টা এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বক্তব্য দেন। এ ছাড়া প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় অনুষ্ঠানে।