শনিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬, ১২:২৩:৪৭

সঞ্চয়পত্রে কী ছিল আগে, কী হলো এখন? যে আশঙ্কা

সঞ্চয়পত্রে কী ছিল আগে, কী হলো এখন? যে আশঙ্কা

এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : জাতীয় সঞ্চয়পত্র দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ বিনিয়োগের অন্যতম ভরসা। ব্যাংকে সুদের হার কম থাকায় অনেকেই মাসিক খরচ চালাতে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু চলতি বছরের শুরুতেই কোনও ঘোষণা বা প্রজ্ঞাপন ছাড়াই সঞ্চয়পত্রে উৎসে কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ায়— সেই নির্ভরতার জায়গায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ নির্বিশেষে সব গ্রাহকের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হচ্ছে। এর ফলে আগে যেসব ছোট বিনিয়োগকারী পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে ৫ শতাংশ উৎসে কর সুবিধা পেতেন, সেই সুবিধা কার্যত তুলে নেওয়া হয়েছে।

হিসাবের খাতায় ধরা পড়ছে প্রভাব

উৎসে কর বাড়ানোর প্রভাব সরাসরি পড়ছে বিনিয়োগকারীদের মাসিক আয়ে। একই পরিমাণ বিনিয়োগ থেকে ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে কম টাকা হাতে পাচ্ছেন অনেক গ্রাহক। পার্থক্য সংখ্যায় খুব বড় না হলেও যারা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিয়ে সংসারের নিত্যব্যয় চালান, তাদের জন্য এই কমে আসা আয় তাৎপর্যপূর্ণ।

বিশেষ করে গৃহিণী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বয়স্ক নাগরিক ও স্বল্প আয়ের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে নীরবে— কোনও সরকারি ঘোষণা, প্রজ্ঞাপন বা আগাম অবহিতকরণ ছাড়াই।

কী ছিল আগে, কী হলো এখন

জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, এতদিন পাঁচ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে উৎসে কর ছিল ৫ শতাংশ এবং পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে ছিল ১০ শতাংশ। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখন বিনিয়োগের পরিমাণ যাই হোক না কেন, সবার ক্ষেত্রেই ১০ শতাংশ উৎসে কর কার্যকর করা হয়েছে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের উপ-পরিচালক (প্রশাসন ও জনসংযোগ) মো. রেজানুর রহমান  জানান, “আগে পাঁচ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে উৎসে কর ছিল ৫ শতাংশ এবং বেশি হলে ১০ শতাংশ। এখন সব বিনিয়োগকারীর জন্য ১০ শতাংশ উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়েছে।”

মুনাফা হার অপরিবর্তিত, কিন্তু বাস্তব আয় কম

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো— সরকার চলতি বছরের শুরুতে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা হার কমানোর ঘোষণা দিলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তা প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে কাগজে-কলমে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা হার অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমানে স্কিমভেদে সর্বোচ্চ মুনাফা ১১ দশমিক ৮২ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত।

তবে বাস্তবে বাড়তি উৎসে করের কারণে বিনিয়োগকারীদের হাতে পৌঁছানো টাকার অঙ্ক কমে গেছে। অর্থাৎ, মুনাফা হার অপরিবর্তিত থাকলেও কার্যকর মুনাফা কমে গেছে, বিশেষ করে ছোট বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে।

রাজস্ব বাড়ানো নাকি সঞ্চয় নিরুৎসাহিত?

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের রাজস্ব আহরণের চাপ এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য ব্যবস্থাপনার প্রেক্ষাপটে সঞ্চয়পত্রকে ধীরে ধীরে নিরুৎসাহিত করার নীতি নতুন নয়। তবে সেই নীতির বোঝা যদি তুলনামূলক দুর্বল বিনিয়োগকারীদের ওপর বেশি পড়ে, তাহলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, “সঞ্চয়পত্র মূলত সামাজিক সুরক্ষার বিকল্প একটি হাতিয়ার। এখানে ছোট বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা সুবিধা রাখা ছিল ন্যায্য। সেটি তুলে নেওয়ার আগে স্বচ্ছতা ও ব্যাখ্যা জরুরি ছিল।”

আস্থার সংকটের আশঙ্কা

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের বড় অংশই নিয়মিত আয় বা পেনশনের বাইরে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ খোঁজেন। তাদের অনেকেই ব্যাংক বা পুঁজিবাজারের ঝুঁকি নিতে চান না। হঠাৎ করে কোনও ঘোষণা ছাড়াই উৎসে কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সেই আস্থার জায়গায় চিড় ধরাতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে