এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : জনগণের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে ‘ই-হেলথ’ কার্ড চালুর ঐতিহাসিক নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (৪ মার্চ) দুপুরে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি এই ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রবর্তনের রূপরেখা দেন।
এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে আমূল পরিবর্তনের লক্ষে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এই নিয়োগে ৮০ শতাংশ নারী এবং ২০ শতাংশ পুরুষ প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এছাড়াও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শূন্য পদে দ্রুত চিকিৎসক ও কর্মী নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাইলট প্রকল্প ও বাস্তবায়ন
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে একটি জেলাকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ওই জেলার প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা থেকে শুরু করে বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে এই ‘ই-হেলথ’ পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসা হবে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, দুর্গম এলাকায় চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়কে আরও কঠোর ও সক্রিয় হতে হবে।
ই-হেলথ কার্ড আসলে কী?
ই-হেলথ কার্ড হলো একটি ইলেকট্রনিক কার্ড যা প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা একটি ইউনিক আইডি বহন করবে। এই কার্ডের মূল কাজ হলো রোগীর প্রতিটি মেডিকেল রেকর্ড ডিজিটাল ফরম্যাটে সংরক্ষণ করা। যখনই কোনো রোগী হাসপাতালে যাবেন, চিকিৎসকরা এই কার্ডটি ব্যবহারের মাধ্যমে তার পূর্বের সব রোগের ইতিহাস, পরীক্ষার রিপোর্ট এবং ওষুধের বিবরণ মুহূর্তেই দেখতে পাবেন।
ই-হেলথ কার্ডের বিশেষ সুবিধাসমূহ
ই-হেলথ হচ্ছে মূলত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজ করার একটি আধুনিক পদ্ধতি। এর আওতায় প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি নির্দিষ্ট কার্ড থাকবে, যেখানে মিলবে নিচের সুবিধাগুলো-
মেডিকেল রেকর্ড সংরক্ষণ: রোগীর পূর্বের সকল রোগের ইতিহাস, পরীক্ষার রিপোর্ট এবং প্রেসক্রিপশন এই কার্ডে ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে।
সহজ চিকিৎসা পদ্ধতি: যে কোনো হাসপাতালে গেলে চিকিৎসকরা কার্ডের মাধ্যমে মুহূর্তেই রোগীর পূর্বের সব রেকর্ড দেখতে পারবেন, ফলে নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঝামেলা কমবে।
রেফারেল নেটওয়ার্ক: প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা সদর হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হবে।
প্রান্তিক পর্যায়ে সেবা: এই কার্ডের মাধ্যমে দুর্গম এলাকার মানুষও সহজে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও উন্নত সেবা পাবেন।
রোগীরা যেসব সুবিধা পাবেন
এই ডিজিটাল কার্ডের ফলে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা ক্ষেত্রে বেশ কিছু বৈপ্লবিক সুবিধা ভোগ করবেন-
রিপোর্টের ঝামেলা থেকে মুক্তি: এখন থেকে রোগীদের এক্স-রে, এমআরআই বা রক্ত পরীক্ষার পুরোনো রিপোর্ট ব্যাগে করে বহন করতে হবে না। কার্ডটি স্ক্যান করলেই সব ডাটা চিকিৎসকের কম্পিউটারে চলে আসবে।
ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি হ্রাস: জরুরি অবস্থায় রোগী যদি কথা বলতে না পারেন, তবে চিকিৎসকরা কার্ডের মাধ্যমে তার অ্যালার্জি বা অন্য কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারবেন, যা জীবন বাঁচাতে সহায়ক হবে।
সমন্বিত রেফারেল নেটওয়ার্ক: উপজেলা পর্যায় থেকে জেলা বা বড় মেডিকেল কলেজে রোগী স্থানান্তর করা হলে, রেফারেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আগের সব চিকিৎসার তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী হাসপাতালের ডাক্তাররা পেয়ে যাবেন।
অর্থের সাশ্রয়: পরীক্ষার রিপোর্ট অনলাইনে সংরক্ষিত থাকায় একই পরীক্ষা বারবার করার প্রয়োজন হবে না, যা রোগীর আর্থিক খরচ অনেকটা কমিয়ে দেবে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ই-হেলথ কার্ড ব্যবস্থা কার্যকর করতে দেশজুড়ে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস তৈরি করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে নির্দিষ্ট এলাকায় চালু করা হলেও পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি নাগরিককে এই সেবার আওতায় আনা হবে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথে এই ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বা ই-হেলথ কার্ড অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং অপরিহার্য একটি পদক্ষেপ।
ই-হেলথ কার্ড সংক্রান্ত প্রশ্ন ও উত্তর-
প্রশ্ন: ই-হেলথ কার্ড আসলে কী?
উত্তর: এটি একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র যেখানে একজন রোগীর সব রোগের ইতিহাস, পরীক্ষার রিপোর্ট এবং প্রেসক্রিপশন ডিজিটাল ডাটাবেসে সংরক্ষিত থাকে।
প্রশ্ন: ই-হেলথ কার্ডের প্রধান সুবিধা কী?
উত্তর: প্রধান সুবিধা হলো ডাক্তার পরিবর্তন করলে বা অন্য হাসপাতালে গেলে রোগীকে আর পুরনো ফাইল বা রিপোর্টের স্তূপ বহন করতে হবে না; ডাক্তার কার্ড স্ক্যান করেই সব তথ্য দেখতে পাবেন।
প্রশ্ন: এই কার্ড কি সরকারি ও বেসরকারি উভয় হাসপাতালে ব্যবহার করা যাবে?
উত্তর: সরকারের লক্ষ্য হলো একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে সব হাসপাতালকে যুক্ত করা, যাতে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে এই কার্ডের মাধ্যমে সেবা নেওয়া যায়।
প্রশ্ন: ই-হেলথ কার্ড কীভাবে সংগ্রহ করতে হবে?
উত্তর: প্রাথমিকভাবে নির্দিষ্ট সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হবে। পাইলট প্রকল্প শুরু হলে নির্দিষ্ট জেলার বাসিন্দারা এটি আগে পাবেন।
প্রশ্ন: কার্ডের মাধ্যমে কি ওষুধ কেনা বা ডিসকাউন্ট পাওয়া যাবে?
উত্তর: এটি মূলত তথ্য সংরক্ষণের জন্য, তবে ভবিষ্যতে এর মাধ্যমে সরকারি ভর্তুকি বা স্বাস্থ্য বীমার সুবিধা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রশ্ন: কার্ড হারিয়ে গেলে কি রোগীর সব তথ্য ডিলিট হয়ে যাবে?
উত্তর: না। তথ্যগুলো সুরক্ষিত ক্লাউড সার্ভারে জমা থাকে, তাই নতুন কার্ড সংগ্রহ করলে বা আইডির মাধ্যমে তথ্য পুনরায় ফিরে পাওয়া যাবে।
প্রশ্ন: ই-হেলথ কার্ডে কি ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা থাকবে?
উত্তর: হ্যাঁ, রোগীর অনুমতি বা নির্দিষ্ট এক্সেস কোড ছাড়া কেউ ব্যক্তিগত মেডিকেল রেকর্ড দেখতে পারবে না এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
প্রশ্ন: এই কার্ড চালু হলে কি একই পরীক্ষা বারবার করা লাগবে?
উত্তর: না। পূর্বের টেস্ট রিপোর্ট কার্ডে সংরক্ষিত থাকায় চিকিৎসকরা তা দেখে রোগ নির্ণয় করতে পারবেন, ফলে রোগীর টাকা ও সময় দুটোই বাঁচবে।
প্রশ্ন: ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি কবে আসবে?
উত্তর: প্রধানমন্ত্রী দ্রুত নিয়োগের নির্দেশনা দিয়েছেন। সাধারণত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা সংবাদপত্রের মাধ্যমে এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।
প্রশ্ন: স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগে নারী-পুরুষের অনুপাত কেমন হবে?
উত্তর: এবারের বিশেষত্ব হলো এই নিয়োগের ৮০ শতাংশ নারী এবং ২০ শতাংশ পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।
প্রশ্ন: নিয়োগের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা কী লাগবে?
উত্তর: পদের ধরণ অনুযায়ী যোগ্যতা ভিন্ন হবে, তবে সাধারণত এইচএসসি (HSC) থেকে স্নাতক পাশ প্রার্থীরা আবেদনের সুযোগ পাবেন।
প্রশ্ন: পাইলট প্রকল্প হিসেবে ই-হেলথ কার্ড কোন জেলায় আগে চালু হবে?
উত্তর: এখনো নির্দিষ্ট জেলার নাম ঘোষণা করা হয়নি, তবে খুব শীঘ্রই একটি জেলাকে মডেল হিসেবে বেছে নিয়ে কাজ শুরু করা হবে।
প্রশ্ন: দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য এই কার্ড কীভাবে কাজ করবে?
উত্তর: দুর্গম এলাকায় অফলাইন সিঙ্ক্রোনাইজেশন বা কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে তথ্য আপডেট করার ব্যবস্থা রাখা হবে যাতে ইন্টারনেটের সমস্যা থাকলেও সেবা ব্যাহত না হয়।
প্রশ্ন: রেফারেল নেটওয়ার্ক পদ্ধতিটি কী?
উত্তর: এর মাধ্যমে ইউনিয়ন বা উপজেলা হাসপাতাল থেকে কোনো রোগীকে বড় হাসপাতালে পাঠানো হলে তার সব তথ্য মুহূর্তেই পরবর্তী হাসপাতালের ডাক্তারদের কাছে পৌঁছে যাবে।
প্রশ্ন: ই-হেলথ কার্ডের জন্য কি কোনো ফি দিতে হবে?
উত্তর: সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রান্তিক জনগণের জন্য এটি বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে প্রদানের কথা রয়েছে।