বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:২৪:৫৭

প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সবুজ সংকেত পেলেই ধনী-গরিব নির্বিশেষে এই কর আরোপ

 প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সবুজ সংকেত পেলেই ধনী-গরিব নির্বিশেষে এই কর আরোপ

এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদের ওপর আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে আয়কর ধার্য হতে পারে। নিকটাত্মীয় যেমন বাবা-মা, ভাইবোনের কাছ থেকে সম্পত্তি পেলে কম হারে এবং দূরবর্তী আত্মীয় যেমন দাদা-দাদি, নানা-নানি, শ্বশুর-শাশুড়ির কাছ থেকে সম্পত্তি পেলে বেশি হারে আয়কর আরোপের চিন্তা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সবুজ সংকেত পেলেই ধনী-গরিব নির্বিশেষে এই কর আরোপ করা হতে পারে।

গত ৩০ মার্চ ইনহেরিট্যান্স ট্যাক্স বা উত্তরাধিকার কর আইন প্রণয়ন ও এর প্রভাব মূল্যায়নে এনবিআর ৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কর অঞ্চল-২২ এর কমিশনার নজরুল আলম চৌধুরীকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়। এই কমিটিকে কর হার ধার্য, রাজস্ব প্রভাব মূল্যায়ন এবং কর ফাঁকি রোধে করণীয় উল্লেখ করে ২০ এপ্রিলের মধ্যে এনবিআরে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।

কমিটির রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, উন্নত বিশ্বের আদলে নিকট ও দূরবর্তী-এই দুই শ্রেণির সম্পর্কের ভিত্তিতে উত্তরাধিকার কর আরোপের সুপারিশ করেছে কমিটি। এক্ষেত্রে যার যত বেশি সম্পদ, তাকে তত বেশি কর দিতে হবে। অর্থাৎ সম্পদের মূল্যের ওপর কর আরোপ করা হবে। যেমন : বাবা-মা, ভাইবোনের কাছ থেকে সম্পত্তি পেলে ১ থেকে ৫ শতাংশ আয়কর দিতে হবে। এক্ষেত্রে সম্পদের পরিমাণ এক কোটি টাকা পর্যন্ত এক শতাংশ, পরবর্তী ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত (মোট ৬ কোটি টাকা) ২ শতাংশ, পরবর্তী ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত (মোট ১১ কোটি টাকা) ৩ শতাংশ, ১১ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে সম্পদমূল্যের ৫ শতাংশ হারে আয়কর দিতে হবে।

দূরবর্তী আত্মীয়ের ক্ষেত্রে সম্পদের স্ল্যাব একই রাখলেও কর হার বাড়ানোর সুপারিশ করেছে কমিটি। এক কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদ থাকলে ৩ শতাংশ, পরবর্তী ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত (মোট ৬ কোটি টাকা) ৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত (মোট ১১ কোটি টাকা) ৭ শতাংশ, ১১ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে সম্পদমূল্যের ১০ শতাংশ হারে আয়কর দিতে হবে।

কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, উত্তরাধিকার কর আরোপ করতে পারলে গত বছরের তুলনায় আয়কর আদায় ১-৩ শতাংশ বাড়তে পারে। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ১৪ থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকা। তবে এজন্য উত্তরাধিকার কর আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অন্যান্য আইন বাতিল ও আয়কর আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিটির এক সদস্য যুগান্তরকে জানান, ইতোমধ্যেই প্রতিবেদন এনবিআরে জমা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা এনবিআর নির্ধারণ করবে। প্রতিবেদনে উত্তরাধিকার করের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ-দুটোই উল্লেখ করা হয়েছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, কমিটির রিপোর্ট যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই কর আরোপ অত্যন্ত দুরূহ ও স্পর্শকাতর ব্যাপার। এজন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তাই উত্তরাধিকার কর আইন নিয়ে অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবে এনবিআর। তাদের সবুজ সংকেত পেলে বাজেটে আইন উত্থাপন করা হবে। মোদ্দা কথা, উত্তরাধিকার করের পুরোটাই নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ের ওপর।

বর্তমানে আয়কর আইনে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ব্যবসায়ের ওপর কর আদায়ের বিধান রয়েছে। ১৯০ ধারায় বলা আছে, মৃত্যু ব্যতীত অন্য কোনোভাবে যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির ব্যবসায়ের উত্তরাধিকারী হন, সেক্ষেত্রে তিনি যে বৎসর উত্তরাধিকার লাভ করেছেন, সে বৎসরে উত্তরাধিকার লাভের পূর্বের সময়ের জন্য পূর্বসূরির (বাবা-মা বা আত্মীয়স্বজন) কর নির্ধারণ হবে। উত্তরাধিকার লাভ হওয়ার পরবর্তী সময়ের জন্য উত্তরসূরির কর নির্ধারণ হবে।

ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখা গেছে, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই উত্তরাধিকার কর আইন আছে। সম্পর্কের ভিত্তিতে কর হারে ভিন্নতা রয়েছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেন, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রে ‘এস্টেট ট্যাক্স’ দিতে হয় নাগরিকদের। তবে অনেক দেশ তাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বা অন্য কোনো কারণে উত্তরাধিকার কর বা এস্টেট ট্যাক্স সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করেছে। এ তালিকায় আছে-অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, পর্তুগাল, কানাডা, সুইডেন, নরওয়ে, অস্ট্রিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত। অবশ্য উন্নত বিশ্বের যেসব দেশে উত্তরাধিকার কর নেই, সেখানে ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স রয়েছে। অরগানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) তথ্যানুযায়ী, সেসব দেশ জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ এই কর থেকে আদায় করে থাকে।

সূত্র জানায়, আগামী বাজেটে সম্পদ কর ও উত্তরাধিকর কর-এ দুটো আইনই আরোপ করতে চায় এনবিআর। মূলত অতি ধনীদের কাছ থেকে উচ্চহারে কর আদায় এবং বৈষম্য দূর করতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। উত্তরাধিকার কর কৃষক থেকে শহরের অতি ধনী সবাইকে দিতে হবে। ব্যক্তি শ্রেণির করদাতারা রিটার্নে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত যে সম্পদ দেখিয়ে থাকেন, সেই সম্পদের ওপর কর দিতে হবে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০১৫ সাল থেকে আয়কর রিটার্ন জমা দেন জনাব ‘ক’। যেখানে তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে নিজ জেলায় বাবার কাছ থেকে ১০ শতাংশ কৃষিজমি প্রাপ্তির কথা উল্লেখ করেছেন, যার মূল্য ৫ লাখ টাকা। যেহেতু বাবার কাছ থেকে তিনি সম্পত্তি পেয়েছেন, সেহেতু তাকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত স্ল্যাবে ১ শতাংশ হারে ৫ হাজার টাকা উত্তরাধিকার কর দিতে হবে। এই সম্পত্তি যদি দাদা-দাদি বা শ্বশুর-শাশুড়ির কাছ থেকে পেয়ে থাকেন তাহলে ৩ শতাংশ হারে ১৫ হাজার টাকা কর দিতে হবে।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই উত্তরাধিকার কর বা এস্টেট ট্যাক্স আছে। বাংলাদেশেও রাজস্ব আদায় বাড়াতে এটি নতুন ক্ষেত্র হতে পারে। এছাড়া সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে ও সামাজিক বৈষম্য হ্রাসে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কর হার ও স্ল্যাব যুক্তিসংগত হওয়া উচিত। না হলে সুফল পাওয়া যাবে না। তিনি আরও বলেন, রাজস্ব আদায় বাড়াতে এনবিআরকে এ ধরনের নতুন নতুন ক্ষেত্রের পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।-যুগান্তর

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে