এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এক পক্ষ সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনা করে একে স্বাগত জানালেও, অন্য পক্ষ মূল্যস্ফীতি ও বাজার পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে এক ধাপে বাস্তবায়নের দাবি তুলছে।
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২১ সদস্যের বেতন কমিশনের এই প্রস্তাব পুরোপুরি একবারে বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের খসড়া করা হয়েছে।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে (২০২৬-২৭ অর্থবছর) বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে (২০২৭-২৮ অর্থবছর) মূল বেতনের বাকি ৫০ শতাংশ কার্যকর হবে। আর শেষ ধাপে গিয়ে মূল বেতনের সঙ্গে বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পুরোপুরি সমন্বয় করা হবে।
প্রস্তাবিত কাঠামোতে বর্তমানে বিদ্যমান ২০ গ্রেডের কাঠামোটিই বহাল থাকছে। তবে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এর ফলে সার্বিকভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ও বেতন কমিশনের সদস্য ড. এ কে এনামুল হক জানান, কোনো সরকারি কর্মচারী যেন দারিদ্র্যসীমার নিচে না থাকেন, তা নিশ্চিত করতেই সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন অন্য গ্রেডের তুলনায় কিছুটা বেশি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
এবারের পে স্কেলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক সুপারিশ করা হয়েছে। যেমন বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা এবং যাতায়াত ভাতা ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বাড়িভাড়ার ক্ষেত্রে ১১তম থেকে ২০তম ধাপে তুলনামূলক বেশি হারে সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে।
পেনশন ও ভাতার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। যেখানে ২০ হাজার টাকার কম পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বয়সভিত্তিক চিকিৎসা ভাতা ৫,০০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা করার সুপারিশ রয়েছে।
বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতির নেতা আব্দুল মালেক এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অ-ক্যাডার কর্মচারী সিকান্দার আলীসহ অনেকের দাবি, পে স্কেল এক ধাপেই বাস্তবায়ন করতে হবে। তাদের আশঙ্কা, তিন বছর ধরে দফায় দফায় বাস্তবায়নের খবর বাজারে এলে প্রতি বছরই নতুন করে জিনিসপত্রের দাম ও মূল্যস্ফীতি বাড়বে।
অন্যদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরেকটি অংশ মনে করে, নতুন সরকারের জন্য নবম পে কমিশনের সুপারিশ শতভাগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করার মতো আর্থিক সক্ষমতা এই মুহূর্তে সরকারের নেই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের মতে, নির্বাচিত সরকারের প্রতি তাদের আস্থা রয়েছে এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে বিক্ষোভ না করে সরকারি নিয়ম মেনে চলাই প্রধান দায়িত্ব।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই পে স্কেলের ফলে সামরিক বাহিনী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসহ মোট উপকারভোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২৪ লাখ। এর বাইরেও সুবিধা পাবেন আরও ৯ লাখ পেনশনভোগী।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ২১ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রতিবেদন বর্তমান সরকারের কাছে হস্তান্তর করে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আসন্ন বাজেটে এ বিষয়ে চূড়ান্ত ও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।