জাহিদুল ইসলাম : সৌদি আরবে বসবাসরত বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের ই-পাসপোর্টসংক্রান্ত ভোগান্তি কমাতে একাধিক নতুন উদ্যোগ নিয়েছে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস। অতিরিক্ত বায়োমেট্রিক যন্ত্রপাতি ও জনবল যুক্ত করা, কনস্যুলার ক্যাম্প বাড়ানো এবং নতুন অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট চালুর ঘোষণা দিয়েছে তারা।
গত ৯ জুলাই কালের কণ্ঠে প্রকাশিত ‘প্রবাসীরা পাসপোর্ট নিয়ে মহাযন্ত্রণায়’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দীর্ঘ অপেক্ষা, সীমিত বায়োমেট্রিক সুবিধা ও দালালচক্রের তৎপরতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। এর দুই দিনের মাথায় দূতাবাস এসংক্রান্ত নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে।
গত রবিবার জারি করা এক নোটিশে দূতাবাস পাসপোর্ট সেবাসংক্রান্ত সমস্যার কথা স্বীকার করেছে। এতে বলা হয়েছে, ই-পাসপোর্ট সেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ ও বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট মেশিনের ঘাটতির কারণে এত দিন চাহিদা অনুযায়ী সেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া বিভিন্ন শহরে কনস্যুলার ক্যাম্প পরিচালনার সময়ও নানা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে সম্প্রতি অতিরিক্ত বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট মেশিন (কিট) হাতে পাওয়ায় দ্রুত সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দূতাবাস জানিয়েছে, অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের পাশাপাশি কনস্যুলার ট্যুর ও ক্যাম্পের সংখ্যা বাড়ানো হবে। পর্যায়ক্রমে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে গিয়ে প্রবাসীদের ই-পাসপোর্ট সেবা দেওয়া হবে।
যাঁরা এরই মধ্যে অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন করেছেন, তাঁদের বায়োমেট্রিক গ্রহণে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে যাঁদের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বা শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে, কিন্তু এখনো আবেদন করতে পারেননি, তাঁদের আবেদন সম্পন্ন হওয়ার পর দ্রুত বায়োমেট্রিক নেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে।
নোটিশে আরো বলা হয়েছে, ধাপে ধাপে অতিরিক্ত অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট চালু করা হচ্ছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে অ্যাপয়েন্টমেন্ট না পাওয়ার যে অভিযোগ ছিল, তা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করছে দূতাবাস।
তবে যাঁদের বর্তমান এমআরপি বা ই-পাসপোর্টের মেয়াদ এক বছরের বেশি রয়েছে, তাঁদের এখনই নতুন ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন না করার অনুরোধ জানিয়েছে দূতাবাস।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অপ্রয়োজনীয় আবেদন কমলে জরুরি প্রয়োজন থাকা প্রবাসীদের দ্রুত সেবা দেওয়া সহজ হবে। দূতাবাস মনে করিয়ে দিয়েছে, বর্তমান এমআরপি পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেটি বৈধ থাকবে এবং ভ্রমণেও কোনো সমস্যা হবে না। প্রবাসীদের ধৈর্য ধরে কনস্যুলার ক্যাম্পে সেবা নেওয়ার আহবান জানিয়েছে দূতাবাস। পাশাপাশি কোনো ধরনের প্রতারণা বা দালালের ফাঁদে না পড়ার জন্য সতর্ক থাকার অনুরোধ করা হয়েছে। কনস্যুলার ক্যাম্পগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে নিয়মিত বিভিন্ন শহরে সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়।
সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, ই-পাসপোর্টের বায়োমেট্রিক দিতে আট থেকে ১০ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জরুরি প্রয়োজনে দেশে যাওয়া, চাকরি পরিবর্তন কিংবা আকামা নবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজও ব্যাহত হচ্ছে।
প্রবাসীদের ভাষ্য, দূতাবাসের নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। তবে ঘোষণাগুলো কত দ্রুত বাস্তবে কার্যকর হয় এবং অপেক্ষমাণ আবেদনকারীরা কত দ্রুত সেবা পান, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তাঁদের মতে, শুধু সাময়িক ব্যবস্থা নয়, ভবিষ্যতে বাড়তে থাকা চাহিদা মোকাবেলায় স্থায়ীভাবে জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, নতুন বায়োমেট্রিক মেশিন ও অতিরিক্ত অ্যাপয়েন্টমেন্ট চালুর ফলে কয়েক মাস ধরে জমে থাকা আবেদন নিষ্পত্তির গতি বাড়বে। এতে সৌদি আরবে বসবাসরত লাখো বাংলাদেশির জন্য পাসপোর্টসেবা আরো সহজলভ্য হবে।
এক মাসের মধ্যে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস রাষ্ট্রদূতের : সৌদি আরবে প্রবাসীদের পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সেবাসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান আগামী এক মাসের মধ্যে হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দেলোয়ার হোসেন।
রবিবার রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়সভায় রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘গত বছরের শেষ ভাগে এমআরপি বন্ধ হয়ে ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম চালু হয়। এতে কারিগরি কারণে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহে কিছুটা ধীরগতি তৈরি হয়েছিল। তবে এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং জনবল সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে পাসপোর্ট নবায়ন ও অ্যাপয়েন্টমেন্টসংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতা স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে এবং প্রবাসীরা কোনো বিলম্ব ছাড়াই বায়োমেট্রিক দিতে পারবেন। দরকার হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ২৪ ঘণ্টা কাজ করে জট কমিয়ে আনবেন।’ তবে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ উল্লেখ করে মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘দূতাবাসের সেবার মান নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে আসা অভিযোগগুলোর কোনো দালিলিক ভিত্তি নেই। যদি সুনির্দিষ্ট কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ কেউ উপস্থাপন করতে পারেন, তবে আমি স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াব।’
কিছু প্রবাসী বাংলাদেশির অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বাংলাদেশির হাতে অন্য বাংলাদেশির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। সৌদি কর্তৃপক্ষের সহায়তায় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।’-সূত্র : কালের কণ্ঠ