শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ০৯:১৮:৫২

নৌকাডুবির ঘটনায় ৫০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা

নৌকাডুবির ঘটনায় ৫০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা

এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : মিয়ানমারের উপকূলে দুটি নৌকাডুবির ঘটনায় ৫০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। নিহতদের বেশির ভাগ রোহিঙ্গা, যাদের মধ্যে বাংলাদেশের শরণার্থীশিবির থেকে সমুদ্রপথে যাত্রা করা লোকজনও ছিল।

এর মধ্যেই কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূলে তিনটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার এবং বঙ্গোপসাগরে জেলেদের একাধিক ভাসমান মরদেহ দেখার দাবি নতুন করে নৌকাডুবির ঘটনায় উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যদিও এসব মরদেহের সঙ্গে ওই দুর্ঘটনার সরাসরি কোনো সম্পর্কের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হয়নি।

তবে গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে এই নৌকাডুবিতে প্রাণহানির তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)।

গত ১১ জুলাই সাগরে মাছ শিকার করার সময় জেলেরা বঙ্গোপসাগরের গভীরে নারীদের লাশ ভাসমান অবস্থায় দেখেছেন।

তাঁরা বলেছেন, মালয়েশিয়াগামী এসব নৌকা উত্তাল সাগরে ডুবে গেছে। শাহ পরীর দ্বীপ ও সেন্ট মার্টিনের জেলেরা এই দৃশ্য দেখেছেন। তাঁরা বলেছেন, নারীদের ভাসমান লাশ দেখে ভয়ে জাল তুলে তাঁরা অন্যদিকে চলে যান।

এ বিষয়ে শাহ পরীর দ্বীপের ট্রলার মাঝি আবু বক্কর বলেন, ‘প্রায় এক সপ্তাহ আগে মাছ ধরতে গিয়ে সাগরে জাল ফেলেছিলাম।

জাল তোলার সময় দূরে বেশ কয়েকজন নারীর ভাসমান মরদেহ দেখতে পাই। দৃশ্যটি দেখে ভয় পেয়ে দ্রুত অন্যদিকে ট্রলার নিয়ে চলে যাই। তখন সাগরে প্রবল বাতাস ছিল। আমার ধারণা, ওই মরদেহগুলো রোহিঙ্গাদের হতে পারে।’
পাঁচ দিন আগেও শাহ পরীর দ্বীপের ছোট নৌকার মাঝিরা সেন্ট মার্টিনের পূর্ব-দক্ষিণে সাগরে তিন শিশুসহ দুই নারীর ভাসমান মরদেহ দেখতে পান।

স্থানীয় জেলে ছৈয়দ আলম বলেন, ‘এখন মনে হচ্ছে, সাগরের বিভিন্ন জায়গায় মরদেহ ভাসছে। এগুলো সম্ভবত বড় কোনো ট্রলারডুবির ঘটনা। আমাদের ধারণা, মিয়ানমার থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রার পথে ট্রলারটি গভীর সাগরে ডুবে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যেখানে মাছ ধরতে যাই, সেসব এলাকায়ও মরদেহ দেখা যাচ্ছে। এ কারণে জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে এখন সাগরে মাছ ধরতে যেতে ভয় পাচ্ছেন।’

গত ১০ জুলাই টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ এবং বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন সাগরে ভাসমান অবস্থায় পৃথক স্থান থেকে অর্ধগলিত তিনটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছেন টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম।

ওসি বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা তিন নারীর লাশ উদ্ধার করি। এরা রোহিঙ্গা। তবে আজকে (গতকাল) গণমাধ্যমে মিয়ানমারের উপকূলের কাছাকাছি রোহিঙ্গা বহনকারী ট্রলারডুবির ঘটনার খবর পেয়েছি। তা ছাড়া নাফ নদ ও সাগরে ভাসমান মৃতদেহের খোঁজখবর নেওয়া হবে।’

কোস্ট গার্ড সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রে জানা গেছে, জুলাই মাসের প্রথম দিকে মিয়ানমার উপকূলে একটি নৌকাডুবির সংবাদ তাদের নজরে এসেছিল। মিয়ানমারের রাখাইন এলাকা থেকে ওই সূত্রের কাছে সংবাদটি আসে। কিন্তু বাংলাদেশ জলসীমার বাইরের ঘটনা হওয়ায় সেটি নিয়ে বিস্তারিত জানা অসম্ভব ছিল।

৯ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে মাথা ও পাবিহীন একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সৈকতে দায়িত্ব পালনরত বিচকর্মীরা পানিতে ভাসতে থাকা মরদেহটি দেখে পুলিশে খবর দেন। পরে কক্সবাজার সদর মডেল থানার এসআই সরোয়ারের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, মরদেহটির পরিচয় শনাক্ত এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া ও তদন্ত চলছে।

ইউএনএইচসিআর ও আইওএম বলছে, সর্বশেষ ঘটনায় প্রায় ২৫০ আরোহী নিয়ে অন্য একটি নৌকা যাত্রার কিছুক্ষণ পরই যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর প্রায় ২৮০ জন আরোহী নিয়ে আরেকটি নৌকা ৮ জুলাই মিয়ানমারের ইরাবতী উপকূলের কাছে ডুবে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছে। শরণার্থী ও অভিবাসীদের জন্য এই পথ বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সমুদ্রপথে পরিণত হয়েছে।

ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতাদের ভাষ্য : মিয়ানমারের রাখাইনে আরাকান আর্মি (এএ) তাদের দখলে থাকা এলাকায় রোহিঙ্গাদের তাড়াতে নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সেখানকার রোহিঙ্গারা সাগরপথ বেছে নিয়েছে। সর্বশেষ গত জুন মাসের শেষে নৌকা দুটি আরাকানের পাউকতাও টাউনশিপ থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রাকালে সাগরে ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

এ প্রসঙ্গে উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা ডক্টর জোবাইর বলেন, ‘রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণরূপে বিতাড়ন করতে দীর্ঘদিন ধরে আরাকান আর্মি পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে এই বর্ষার সময় মালয়েশিয়ার সাগরপথে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সেখানে আমাদের ক্যাম্পের রোহিঙ্গাও ছিল বলে জানা গেছে।’

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে