এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি থেকে কোনোভাবেই সরে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এই দাবি থেকে সরে আসতে তাদের লোভ দেখানো হয়েছে, চাপও দেওয়া হচ্ছে। তবে কোনো চাপ বা প্রলোভনই তাদের অবস্থান বদলাতে পারবে না।
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবি জানানো হয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবি থেকে সরে আসতে আমাদের চাপ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কোনো লোভ কিংবা চাপ আমাদের জনগণের গণরায় বাস্তবায়নের দাবি থেকে একচুলও সরাতে পারবে না। প্রয়োজনে জীবন যাবে, তবু জনগণের সঙ্গে সরকারের মতো বিশ্বাসঘাতকতা করব না।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে দেশবাসীকে সংস্কারের পক্ষে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের দিনই তিনি ও তার দলের সংসদ সদস্যরা গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। এর মাধ্যমে তারা শুধু জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাই করেননি, জনগণের সঙ্গে প্রতারণাও করেছেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন, তাদের প্রতি তিনি গভীর শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে ১৯৭১ সাল থেকে দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া সব শহিদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং আহতদের সুস্থতা কামনা করেন।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বের কৃতিত্ব তরুণ প্রজন্মের। দেশবাসীর জীবন ও রক্তের ফসলই জুলাই গণঅভ্যুত্থান। এই আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে কোনো ব্যক্তি বা দল এককভাবে কৃতিত্ব দাবি করলে জাতি তা মেনে নেবে না; বরং ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে।
জুলাই যোদ্ধাদের বিভাজনের বিরুদ্ধে অবস্থান জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের নিয়ে রাজনীতি করা উচিত নয়। এখনো অনেক জুলাই যোদ্ধা হাসপাতালে ও ঘরে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। অথচ সরকার তাদের দিকে তাকাচ্ছে না। শহিদ পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া এবং আহতদের পুনর্বাসন করা রাষ্ট্রের কর্তব্য হলেও সরকার সেই দায়িত্ব পালন করছে না।
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘তারা বলছেন, মাত্র পাঁচ মাসে আমরা এত ব্যস্ত হয়ে গেলাম কেন? আমি পাল্টা প্রশ্ন করি, মাত্র পাঁচ মাসে আপনারা এত বিশ্বাসঘাতকতা করলেন কেন? কেন ফ্যাসিবাদের ফটোকপি হয়ে উঠলেন? এ কারণেই আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য।’
তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হবে আপসহীন ও তীব্র। জনগণের অধিকার হরণ করা হলে তারা ‘অগ্নিগিরির মতো জ্বলে উঠবেন’।
সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, তিনি কয়েক মাস ধরে প্রধানমন্ত্রীকে বিভেদ সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সেই আহ্বান উপেক্ষিত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে পতনের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।
তাকে ‘রাজাকার’ বলা হচ্ছে উল্লেখ করে অলি আহমেদ বলেন, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন করেছিলেন। তাহলে কি তাকেও রাজাকার বলতে হবে? তিনি বলেন, ‘রাজাকার’ ইস্যুর রাজনৈতিক ব্যবহার জনগণ আর শুনতে চায় না।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য ডা. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, দেশের মানুষের সর্বত্র একটাই দাবি—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর আগের দিনের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একদিকে দলীয় ছাত্রসংগঠন ও যুবদলের ‘হেলমেট বাহিনী’ দিয়ে বিরোধী মত দমন করা হচ্ছে, অন্যদিকে ঐক্যের কথা বলা হচ্ছে। তার ভাষায়, এটি ফ্যাসিবাদী আচরণ।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, জামায়াতের আমির লন্ডন চুক্তির অংশ ছিলেন না। তিনি জুলাই জাদুঘরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েও সেখানে না গিয়ে রাজপথে জনতার কাতারে যোগ দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ না দিয়ে সংবিধান সংস্কারের দাবিতে অবস্থান নেওয়া জামায়াতের আমিরের একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী বলেন, গণভোটের গণরায় উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে সরকারের জন্য ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে।
আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘৫ আগস্ট মানে মুক্তি। তিনি আরও বলেন, আজকের বিএনপি বেগম জিয়ার বিএনপি নয়। এই বিএনপি আপসকামী বিএনপি। এই বিএনপি গণবিরোধী কাজ করে হাসিনার পথে যাত্রা শুরু করেছে। বিএনপি যদি হাসিনার পথেই হাঁটতে থাকে প্রয়োজনে আমরা আবারও গুপ্ত হবো। তবুও গণভোটে জনগণের গণরায় বাস্তবায়নের দাবি আমরা আদায় করবই, করব।’
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, বিএনপির ইতিহাস আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের। তিনি সরকারকে ‘নব্য স্বৈরাচার’ না হওয়ার আহ্বান জানান।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, নতুন সরকারও পুরোনো ফ্যাসিবাদ ফিরিয়ে এনেছে। গুম প্রতিরোধ আইনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এই আইনে গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপর দেওয়ায় বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন।