এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : সদ্য অনুমোদিত নবম জাতীয় পে স্কেলে সরকারি চাকরিতে নতুন করে যোগ দেওয়া ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি বেতন-ভাতা পাবেন। তবে যারা ইতোমধ্যে সরকারি চাকরিতে আছেন, তাদের বেতন বৃদ্ধির হিসাব হবে কিছুটা ভিন্ন। চাকরির মেয়াদ, বর্তমান মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট ও অন্যান্য সুবিধার ওপর নির্ভর করবে তাদের নতুন বেতন-ভাতার পরিমাণ।
বর্তমানে সরকারি চাকরিতে ২০টি গ্রেড রয়েছে। বিসিএস ক্যাডারসহ প্রথম শ্রেণির অধিকাংশ কর্মকর্তা নবম গ্রেডে যোগ দেন। অন্যদিকে বিভিন্ন সরকারি পদে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত নিয়োগ হয়ে থাকে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদ ১৩তম গ্রেডের এবং প্রধান শিক্ষকের পদ বর্তমানে ১০ম গ্রেডের।
২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে নবম গ্রেডের মূল বেতন ছিল ২২ হাজার টাকা। নতুন বেতনকাঠামোয় এ গ্রেডের মূল বেতন দ্বিগুণ হয়ে ৪৪ হাজার টাকা হয়েছে। কোনো কোনো পদে চাকরিতে যোগদানের সময় একটি অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
মূল বেতনের পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীরা নির্দিষ্ট হারে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, সন্তানের শিক্ষাসহায়ক ভাতা, উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা এবং দায়িত্ব ও যাতায়াতের জন্য টিএ-ডিএসহ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা পান। নতুন কাঠামোয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ফোন ভাতাও যুক্ত হয়েছে। তবে এসব ভাতার পরিমাণ গ্রেড ও কর্মস্থলভেদে ভিন্ন।
বর্তমানে ঢাকায় মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, অন্যান্য বিভাগীয় শহরে ৪৫ শতাংশ এবং জেলা শহরে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে গ্রেড ও এলাকার ভিত্তিতে এতে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।
তিন ধাপে বাড়বে মূল বেতন
গত সোমবার অনুমোদিত সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামোতে গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। মূল বেতন ও ভাতাসহ মোট চার ধাপে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। নতুন কাঠামো কার্যকর ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরু হলে এতদিন চালু থাকা মূল বেতনের ১৫ শতাংশ ‘বিশেষ সুবিধা’ বাতিল হয়ে যাবে।
প্রথম থেকে নবম গ্রেডের চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে জুলাই থেকে নতুন বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ কার্যকর হবে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে দ্বিতীয় ধাপে আরও ৩০ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জুলাই থেকে অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ কার্যকর হবে। নতুন হারে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। এর আগ পর্যন্ত পুরোনো হারে ভাতাগুলো বহাল থাকবে।
অন্যদিকে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিজীবীদের বেতন বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য প্রথম ধাপে বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে ২৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ কার্যকর হবে। নতুন ভাতাগুলো তারাও ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে পাবেন।
নবম গ্রেডে নতুনদের শুরুতে বেতন ৩০ হাজার ৮০০
ধরা যাক, একজন নতুন চাকরিজীবী ২০২৬ সালের জুলাইয়ে নবম গ্রেডে যোগ দিলেন। পুরোনো কাঠামোয় এই গ্রেডের মূল বেতন ছিল ২২ হাজার টাকা।
নতুন কাঠামোয় প্রথম ধাপে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে তার মূল বেতন হবে ৩০ হাজার ৮০০ টাকা। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৩০ শতাংশ অর্থাৎ ৬ হাজার ৬০০ টাকা যোগ হয়ে মূল বেতন দাঁড়াবে ৩৭ হাজার ৪০০ টাকা। তৃতীয় ধাপে আরও ৬ হাজার ৬০০ টাকা যোগ হলে ২০২৭ সালের জুলাই থেকে মূল বেতন হবে ৪৪ হাজার টাকা।
২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন হারে ভাতাগুলো যুক্ত হবে। তখন ঢাকায় কর্মরত নবম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার ৪৪ হাজার টাকা মূল বেতনের সঙ্গে ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া হিসেবে ২২ হাজার টাকা যোগ হবে। চিকিৎসা, শিক্ষাসহায়ক, উৎসব ও অন্যান্য ভাতা যোগ হলে তার মোট বেতন-ভাতা প্রায় ৭০ হাজার টাকা হতে পারে।
ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে এ গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ সম্প্রতি ১০ম গ্রেডে উন্নীত হয়েছে। পুরোনো কাঠামোয় এ গ্রেডের শুরুতে মূল বেতন ছিল ১৬ হাজার টাকা। নতুন কাঠামোয় তা বেড়ে ৩২ হাজার টাকা হবে।
প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে মূল বেতন হবে ২৪ হাজার টাকা। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৪ হাজার এবং তৃতীয় ধাপে আরও ৪ হাজার টাকা যোগ হয়ে ২০২৭ সালের জুলাই থেকে মূল বেতন দাঁড়াবে ৩২ হাজার টাকা।
ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে এ গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে বাড়িভাড়াসহ নতুন ভাতা যুক্ত হলে নতুন একজন প্রধান শিক্ষক শুরুতেই ৫০ হাজার টাকার বেশি মোট বেতন-ভাতা পেতে পারেন।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদ ১৩তম গ্রেডের। পুরোনো কাঠামোয় এ গ্রেডের মূল বেতন শুরু হতো ১১ হাজার টাকা থেকে। নতুন কাঠামোয় তা শুরু হবে ২৪ হাজার টাকা দিয়ে। ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে সর্বোচ্চ মূল বেতন ৫৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে ২০২৮ সাল থেকে নতুন একজন সহকারী শিক্ষকের মোট বেতন-ভাতা প্রায় ৪০ হাজার টাকা হতে পারে।
তবে পুরোনো সহকারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বেতন আরও বেশি হতে পারে। কারণ তাদের চাকরির মেয়াদ ও ইতোমধ্যে পাওয়া ইনক্রিমেন্ট নতুন বেতনের হিসাবকে প্রভাবিত করবে।
নোয়াখালীর ১৭ বছর চাকরির অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সহকারী শিক্ষক জানিয়েছেন, পুরোনো কাঠামোয় ইনক্রিমেন্টসহ তার বর্তমান মূল বেতন ২০ হাজার ৮০০ টাকা। ভাতাসহ তিনি মাসে প্রায় ৩৩ হাজার টাকা পান।
নতুন কাঠামোর প্রথম ধাপে তার মূল বেতন প্রায় ২৭ হাজার ৩০০ টাকা হতে পারে। এর সঙ্গে আগের কাঠামোর বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা যোগ হলে মোট বেতন-ভাতা প্রায় ৪০ হাজার টাকা দাঁড়াতে পারে। সব ধাপ বাস্তবায়নের পর তা বেড়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা হতে পারে।
পুরোনোদের বেতন নির্ভর করবে চাকরির মেয়াদে
নতুন ও পুরোনো সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির মধ্যে পার্থক্যের মূল কারণ হলো ইনক্রিমেন্ট। নতুন একজন নির্দিষ্ট গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন দিয়ে শুরু করলেও পুরোনো চাকরিজীবীর ক্ষেত্রে চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী একাধিক ইনক্রিমেন্ট যুক্ত থাকে। ফলে একই গ্রেডে থাকা দুই কর্মকর্তার মূল বেতনও এক নাও হতে পারে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে ৮০ শতাংশ নিয়োগ সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে একই গ্রেডে থাকা প্রধান শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও চাকরির অভিজ্ঞতার কারণে বেতন-ভাতার পরিমাণে পার্থক্য থাকতে পারে।
সবশেষে নতুন বেতনকাঠামোর বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হবে এ-সংক্রান্ত সরকারি আদেশ জারির পর।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নতুন বেতনকাঠামো সংক্রান্ত আদেশ অর্থ বিভাগ থেকে বুধবার বা বৃহস্পতিবার জারি হতে পারে। ওই আদেশ জারির পর নতুন ও পুরোনো সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতার হিসাব আরও পরিষ্কারভাবে জানা যাবে।