এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত থেকে ইলিশ আমদানির অনুমতি দিয়েছিল মৎস্য অধিদপ্তর। গত দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সাড়ে তিন লাখ কেজির বেশি ইলিশ আমদানি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান ইলিশ উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশে ভারত থেকে ইলিশ আমদানির বিষয়টি নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে।
মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, আমদানির বিষয়টি জানার পর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কীভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তা নিয়ে তিনি মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। এরপর ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠির ভিত্তিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ইলিশ আমদানি বন্ধের সুপারিশ জানিয়ে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ইলিশ সমুদ্রের মাছ এবং প্রজননের জন্য নদীতে আসে। অন্যদিকে ভারতের জেলেরা সমুদ্র থেকেই বেশি ইলিশ ধরে ফেলছেন। এসব কারণেও দেশের ইলিশের মজুত কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এবার বাজারে ইলিশ কম দেখা যাচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীদের চাপে সীমিত পরিসরে কিছু আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইলিশ আমদানি নিষিদ্ধ নয়। আর নতুন করে কোনো ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ২২টি প্রতিষ্ঠান তিন লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে। এসব ইলিশের আমদানিমূল্য প্রায় ছয় কোটি ৯২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এসব ইলিশের পুরোটাই ভারতের গুজরাটের ভারুচ এলাকা থেকে আসছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, ভারত থেকে ইলিশ আমদানির খবর প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ে আলোচনা শুরু হয়। মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানতে চান, এমন একটি স্পর্শকাতর পণ্য আমদানির অনুমতি কীভাবে দেওয়া হলো। পরে তিনি জানতে পারেন, ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আমদানির অনুমতি দিয়েছেন। মন্ত্রী এ সিদ্ধান্তের কারণ জানতে চান। এরপর আমদানি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধের বিষয়ে চিঠি দিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে বিষয়টি তুলে ধরে আমদানি বন্ধের সুপারিশ জানানোর কথা রয়েছে। আর নতুন করে আমদানি করা হবে না বলেও মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ভারত থেকে ইলিশ আমদানির ঘটনা এমন সময়ে সামনে এলো, যখন দেশে ইলিশের উৎপাদন ও আহরণ কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সম্প্রতি ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন-সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্সের সাম্প্রতিক সভায়ও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ইলিশের উৎপাদন কমে গিয়ে বিদেশ থেকে মাছ আমদানি করতে হচ্ছে, এটি উদ্বেগের বিষয়। কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা চিহ্নিত করে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা বলেন তিনি।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই প্রথম বাংলাদেশে ইলিশ আমদানি করা হচ্ছে, এটা আমাদের জন্য লজ্জার। অথচ এ বিষয়টি ঘটাচ্ছেন দুই দেশের ব্যবসায়ীরা। তারা দেশের মানুষের ইলিশ খাওয়ার সমস্যা মেটানোর চেয়ে নিজেদের ব্যবসা ও মুনাফার দিকটিই বেশি বিবেচনায় রেখেছেন বলে ধরে নেওয়া যায়। তারা একসময় দেশের ইলিশ বিদেশে রপ্তানির জন্য তোড়জোড় করেন, অন্য সময় আহরণের ঘাটতির কথা বলে আমদানি করার জন্য মরিয়া হয়ে যান। এটা শুভ লক্ষণ নয়। ইলিশের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মাছের ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানি উভয়ের ক্ষেত্রেই জাতীয় নীতি মেনে চলতে হবে।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে সমকালকে বলেন, যে কোনো মাছ আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে মৎস্য অধিদপ্তর অনুমতি দিয়ে থাকে। ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি আমারও জানা ছিল না। জানার পর আমি মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে জানতে চেয়েছি, কীভাবে এ আমদানির অনুমতি দেওয়া হলো। মহাপরিচালক জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের চাপে সামান্য পরিমাণ ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এরপর আমি নির্দেশ দিয়েছি, আর কোনো ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া যাবে না। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভারত থেকে বাংলাদেশে আর একটি ইলিশও আসবে না।