এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভাগীয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে বেশ কিছু নতুন বিধান যুক্ত করতে যাচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি বিধিমালায় পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনের পরও কেউ পদোন্নতি নিতে না চাইলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করার বিধান রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
খসড়া বিধিমালায় বিভাগীয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে কমিটি বা কমিশনের সুপারিশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই ব্যাচের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির সুপারিশ করা হলে বয়সের ভিত্তিতে তাদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে। আর কমিটি বা কমিশন যাদের আগে পদোন্নতির সুপারিশ করবে, তারা পরে সুপারিশপ্রাপ্তদের চেয়ে জ্যেষ্ঠতা পাবেন।
প্রস্তাবিত বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতির যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তা নিতে অস্বীকৃতি জানালে সেটিকে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
সরকারি চাকরি আইনে অসদাচরণের জন্য লঘু ও গুরুদণ্ডের বিধান রয়েছে। লঘুদণ্ডের মধ্যে রয়েছে তিরস্কার, পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিতকরণ এবং মূল বেতনস্কেলের নিম্নতর কোনো ধাপে অবনমিতকরণ।
গুরুদণ্ডের মধ্যে রয়েছে নিম্নপদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ, বাধ্যতামূলক অবসর এবং সরকারি চাকরি থেকে অপসারণ।
খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, কমিটি বা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে উচ্চতর স্কেলে পদোন্নতি দিতে হবে। বিভাগীয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে নির্ধারিত কোটার মধ্যেই উচ্চতর স্কেলে পদোন্নতি সীমিত রাখতে হবে।
কোনো কারণে কোটার বাইরে অতিরিক্ত পদোন্নতি দেওয়া হলে ওই পদোন্নতিপ্রাপ্তদের জ্যেষ্ঠতা পদোন্নতির তারিখ থেকে গণনা করা যাবে না।
এ ছাড়া কোনো পদে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হলে কমিটি বা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে যোগদানের তারিখ থেকে ওই পদে জ্যেষ্ঠতা গণনা করা যাবে।
জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণেও নতুন নিয়ম
প্রস্তাবিত বিধিমালায় বিভাগীয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের নিয়মও স্পষ্ট করা হয়েছে। কমিটি বা কমিশন আগে যাদের পদোন্নতির সুপারিশ করবে, তারা পরবর্তী সময়ে সুপারিশপ্রাপ্তদের চেয়ে জ্যেষ্ঠতা পাবেন।
একই ব্যাচের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির সুপারিশ করা হলে তাদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা বয়সের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে।
সমন্বিত জ্যেষ্ঠতার ক্ষেত্রে পদোন্নতিযোগ্য পদের ফিডার পদে নিয়মিত যোগদানের তারিখকে ভিত্তি ধরা হবে। যোগদানের তারিখ একই হলে বয়স, বয়সও একই হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের শিক্ষাবর্ষ এবং এরপর ফলাফলের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে। প্রতিটি ফিডার পদের মেধাক্রমও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
মামলা থাকলে পদোন্নতি আটকে যাবে
বিভাগীয় মামলা ও বিচারাধীন ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রেও কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় অভিযোগনামা দাখিল, দুদকের মামলায় চার্জশিট দাখিল, ফৌজদারি মামলা দায়েরের সরকারি অনুমোদন দেওয়া বা গ্রেফতার হলে মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি পদোন্নতি পাবেন না।
কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর লঘুদণ্ডের মেয়াদ এক বছর এবং গুরুদণ্ডের মেয়াদ দুই বছর হলে, দণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও দুই বছর পর্যন্ত তিনি পদোন্নতি পাবেন না।
তবে বিভাগীয় মামলা, দুদকের মামলা বা ফৌজদারি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেলে পদ শূন্য থাকা সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি পাবেন। একই সঙ্গে তিনি ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা পাবেন।
এসিআরে লাগবে ন্যূনতম ৮০ নম্বর
পদোন্নতির যোগ্যতা মূল্যায়নে বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনের (এসিআর) গড় নম্বরও বিবেচনায় নেওয়া হবে। প্রস্তাবিত বিধিমালা অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছর অথবা ফিডার পদে চাকরিকালের মধ্যে যেটি কম, সেই সময়ের ন্যূনতম গড় নম্বর ৮০ থাকতে হবে।
গড় নম্বর ৬৯-এর নিচে হলে তা বিরূপ মন্তব্য হিসেবে গণ্য হবে। এ ছাড়া অবসরোত্তর ছুটি ভোগরত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি পাবেন না।
পদোন্নতিযোগ্য শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি দেওয়া যাবে। তবে লিয়েন বা চলতি দায়িত্বের কারণে সৃষ্ট শূন্য পদে পদোন্নতি দেওয়া যাবে না।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিধি) মো. মোস্তফা জামান যুগান্তরকে বলেন, সরকার ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি বিধিমালা প্রণয়নে কাজ করছে। এরই মধ্যে একটি খসড়া তৈরি করে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হচ্ছে।
নতুন বিধিমালায় কী ধরনের পরিবর্তন আসছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু নতুন বিধি সংযোজন হবেই। তবে বিধিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কাজ শেষ হলে নতুন কী কী বিধান যুক্ত হয়েছে, তা জানা যাবে।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া যুগান্তরকে বলেন, নতুন বিধিমালায় জটিলতা বাড়তে পারে। বিধিমালা যথাযথভাবে প্রণয়ন করা না হলে সরকার মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়তে পারে। তার মতে, আগের বিধিমালা সংশোধন না করে নতুন করে বিধিমালা প্রণয়ন করা হলে আরও জটিলতা তৈরি হতে পারে। প্রশাসনে কর্মকর্তার ঘাটতিও রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
প্রস্তাবিত বিধিমালায় নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে একাধিক নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিভাগীয় পদোন্নতিতে কোটার সীমা, জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ, এসিআরের নম্বর, বিচারাধীন মামলা ও দণ্ডের প্রভাব এবং যোগ্য হয়েও পদোন্নতি না নেওয়ার বিষয়গুলোতে নতুন নিয়ম কার্যকর হতে পারে।