মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৯:২৯

বছরের পর বছর বেতন-ভাতার বাইরে ৪০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী

বছরের পর বছর বেতন-ভাতার বাইরে ৪০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী

এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : দেশের প্রায় সাড়ে তিন হাজার নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী বছরের পর বছর সরকারি বেতন-ভাতার বাইরে রয়েছেন। অনেক শিক্ষক ১৫ থেকে ২০ বছর, কেউ কেউ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিনা বেতনে পাঠদান করছেন।

সংসার চালাতে কেউ টিউশনি, কেউ কৃষিকাজ, আবার কেউ মুদি দোকান করছেন। এরপরও নিয়মিত স্কুল-কলেজ-মাদরাসায় গিয়ে পাঠদান করছেন তারা। দীর্ঘদিনের এ বঞ্চনার অবসানে নতুন করে এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় রয়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা। শিক্ষক সমিতির বিভিন্ন সূত্র জানায়, দেশে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার।

এর মধ্যে নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদরাসা এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ১৬ বছরে নীতিমালা পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিভিন্ন সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের ডিও লেটারের প্রভাবেও নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে।

ফলে আগের সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠিত অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে এমপিও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক দুই দশকের বেশি সময় ধরে বেতন ছাড়া চাকরি করছেন।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সোনাইডাঙ্গা বৈকণ্ঠপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. রুহুল আমিন বলেন, তিনি ২০০২ সাল থেকে ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। একাধিকবার এমপিওভুক্তির আবেদন করেও কোনো ফল পাননি। স্কুল থেকে সামান্য যে টাকা পান সেটি দিয়ে সংসার চলে না।
তাই প্রাইভেট পড়ানোর পাশাপাশি কৃষিকাজ করেন।

যশোর সদরের রূপদিয়ো বালিকা দাখিল মাদরাসার সুপার শরীফুল ইসলাম বলেন, ২০০১ সাল থেকে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ২০০৬ সালে মাদরাসাটি স্বীকৃতি পেলেও এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো বেতন-ভাতা পাননি। ২৬ বছর চাকরি করার পর অবসরের সময় ঘনিয়ে এলেও এমপিওভুক্ত হতে পারেননি তিনি।

সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এক হাজার ৭১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছিল। তবে ওই তালিকা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত করতে আগ্রহী নয় বর্তমান সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তালিকাটি আবার যাচাই-বাছাই করা হবে। পাশাপাশি নতুন করে আবেদন নেওয়া হবে। পরে পুরনো ও নতুন আবেদন একসঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চূড়ান্ত তালিকা করা হবে।

গত বছরের ১৪ থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে তিন হাজার ৬১৫ প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। এর মধ্যে নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে ৮৫৯টি, মাধ্যমিক পর্যায়ে এক হাজার ১৭০টি, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ৬৮৭টি, স্নাতক (পাস) পর্যায়ে ৪৪০টি এবং স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে ৪১৪টি প্রতিষ্ঠান ছিল। এসব আবেদনের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের এক হাজার ৭১৯টি প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য বিবেচনা করা হয়েছিল।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এমপিওভুক্তির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিগগির নতুন এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন আহ্বান করা হবে। আগের তালিকাও যাচাই-বাছাই করা হতে পারে। নতুন করে আবেদন নেওয়া হলেও আগে যোগ্য বিবেচিত প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবে বিবেচনায় আসবে।

নন-এমপিও শিক্ষকদের বাইরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বেসরকারি কলেজের অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষকরাও দীর্ঘদিন ধরে এমপিও সুবিধার বাইরে রয়েছেন। ১৯৯৩ সালে এসব কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু হলেও ওই স্তরের বেশির ভাগ শিক্ষক এখনো এমপিওভুক্ত হননি। বর্তমানে দেশের ৪১৪টি কলেজে কর্মরত প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক সরকারি বেতন-ভাতার বাইরে রয়েছেন।

বাংলাদেশ বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি নেকবর হোসেন বলেন, অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষকরা ৩৩ বছর ধরে বলতে গেলে বিনা বেতনে চাকরি করছেন। কলেজ থেকে সামান্য অর্থ দেওয়া হলেও তা অনিয়মিত। একই প্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেও তারা বেতন বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকরাও দীর্ঘদিন ধরে এমপিও সুবিধার বাইরে রয়েছেন। ১৯৮৪ সালে এসব মাদরাসার যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯৪ সালে রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকদের মাসে ৫০০ টাকা ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পরে সময়ে রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সরকারি হলেও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার অধিকাংশ শিক্ষক এখনো সরকারি বেতন-ভাতার আওতায় আসেননি।

 বর্তমানে রেজিস্ট্রিকৃত অল্পসংখ্যক স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষক তিন হাজার ৩০০ টাকা ভাতা পান। গত বছরের ৩ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত এসব মাদরাসার এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন নেওয়া হলেও প্রায় এক বছর পরও কোনো প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়নি।

দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ এমপিওভুক্ত হলেও সরকারি শিক্ষকদের সঙ্গে তাঁদের বেতন-ভাতায় রয়েছে বৈষম্য। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মূল বেতন পেলেও অন্যান্য সুবিধা তুলনামূলক কম পান। বাড়িভাড়া ভাতা আগে মূল বেতনের সাড়ে ৭ শতাংশ থাকলেও আগামী জুলাই থেকে তা ১৫ শতাংশ করার কথা রয়েছে। চিকিৎসা ভাতা পান মাত্র ৫০০ টাকা। উৎসব ভাতা পান মূল বেতনের ৫০ শতাংশ। ফলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যেও বেতন-ভাতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে।

এদিকে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট গত রবিবার দেশের ৩০ হাজার ৭৮৩টি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা জাতীয়করণের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে। সংগঠনটির হিসাবে, এসব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে সরকারের প্রতিবছর ২৬ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা ব্যয় হবে। বর্তমানে বেতন-ভাতা বাবদ সরকার দেয় ১৭ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা। অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে ৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা। তবে জাতীয়করণ হলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারের আয় হবে আট হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ফলে সরকারের অতিরিক্ত ঘাটতি থাকবে মাত্র ৭০০ কোটি টাকা।

শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের মহাসচিব মো. জাকির হোসেন বলেন, নন-এমপিও শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। রাজনৈতিক কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়নি। শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকদের স্বার্থে দ্রুত নতুন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা প্রয়োজন। স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে।