এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় রীতিমতো ব্যস্ত সময় কাটান। প্রায়দিনই তিনি বাংলাদেশ সরকারের কোনো না কোনো মন্ত্রী বা উপদেষ্টার সঙ্গে মিলিত হন। গত এক সপ্তাহে তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একাধিকবার গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যও রেখেছেন। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি নিয়ে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন।
তবে আচমকাই তিনি সোমবার ঢাকা থেকে নয়াদিল্লি এসেছেন। প্রায় তিনদিনের এই সফরসূচিতেও তিনি ব্যস্ত সময় কাটাবেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। মঙ্গলবার ত্রিবেদী প্রথমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেছেন। ঢাকায় দায়িত্ব নেয়ার পাঁচ মাসের মধ্যে ত্রিবেদী এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠক করলেন।
রাজনীতিবিদ ত্রিবেদীকে কেবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে ঢাকায় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের মাধ্যমে ভারত বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরাসরি রিপোর্ট করার সুযোগ তাকে দেয়া হয়েছে। সেই মোতাবেক ত্রিবেদী বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা এবং তা কীভাবে এগিয়ে নেয়া যায় তা নিয়ে মোদির সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
কূটনৈতিক মহলের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দ্রুত নেয়া যায়—সে লক্ষ্যেই ত্রিবেদীর মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিককে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একটি শক্তিশালী অংশের আপত্তি সত্ত্বেও তাকে নিয়োগ দেয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তাদের মতে, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও মোদির সঙ্গে ত্রিবেদীর সরাসরি যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সাধারণত ক্যারিয়ার কূটনীতিকদের ক্ষেত্রে এ ধরনের সরাসরি যোগাযোগের কোনো সুযোগ থাকে না।
তবে দিল্লিতে থাকা বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সাংবাদিকদের একাংশের মতে, দীনেশ ত্রিবেদীর এই সফরে বাংলাদেশের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সেই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঢাকায় ফেরার বিষয়টিই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আর তাই একই দিনে ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরাজ শেঠের সঙ্গে ত্রিবেদীর বৈঠকটিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এরপর তিনি বৈঠক করবেন ভারতের বিভিন্ন নিরাপত্তা এজেন্সির কর্মকর্তাদের সঙ্গে। আর শেষ বৈঠকটি হবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে।
দিল্লিতে কূটনৈতিক মহলেও ত্রিবেদীর দিল্লি ছুটে আসা এবং একের পর এক বৈঠকের মাধ্যমে কী বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছেন তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
তাদের একাংশ মনে করছেন, ঢাকায় বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে হাসিনার ঢাকায় ফেরা নিয়ে মনোভাবের যে আঁচ পেয়েছেন তা তিনি দিল্লিকে জানাতে এসেছেন। বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও ত্রিবেদী দিল্লিকে অবহিত করেছেন।
সম্প্রতি কার্যক্রম নিষিদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে রিকনসিলিয়েশনের বিষয় নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে তাতে ত্রিবেদীর ভূমিকা রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। তাদের মতে, ত্রিবেদী প্রস্তাবটা ছুঁড়ে দিতে পারেন।
মোদির সঙ্গে বৈঠকের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কোনও কিছু জানানো না হলেও সরকারিভাবে সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে জানানো হয়, বৈঠকে দুই প্রতিবেশী দেশের প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব জোরদার এবং কৌশলগত সামরিক সমন্বয় এগিয়ে নেয়ার বিভিন্ন উপায় নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো পর্যালোচনা করার পাশাপাশি তা আরও সুদৃঢ় করার জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় হাইকমিশনার বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সামরিক বোঝাপড়া, অভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থ এবং যৌথ সহযোগিতার চলমান বিষয়গুলো ভারতীয় সেনাপ্রধানের কাছে তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগে প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেকার বিভিন্ন ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক শুরু হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৯০টি ওয়ার্কিং গ্রুপ রয়েছে বিভিন্ন স্তরে। এর মধ্যে অনেকগুলোই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপের একটি বৈঠক নয়াদিল্লিতে শুরু হচ্ছে। আগামী ৮-৯ অক্টোবরের দুদিনের এই বৈঠকে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল যোগ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।