মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৪০:৫৯

এবার ঘরে বসেই মিলবে জমির জমির রেকর্ড ও পর্চা

এবার ঘরে বসেই মিলবে জমির জমির রেকর্ড ও পর্চা

এমটিনিউজ ডেস্ক : দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে অনলাইন ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে আট কোটির বেশি খতিয়ান বা পর্চা। ফলে জমির রেকর্ড সংগ্রহ, খতিয়ান যাচাই ও ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা গ্রহণের সুযোগ আগের চেয়ে সহজ হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, পর্যায়ক্রমে সব খতিয়ান অনলাইনে যুক্ত করা সম্ভব হলে ভূমি অফিসে নাগরিকদের যাতায়াত কমবে, সাশ্রয় হবে সময় ও অর্থ এবং জমি নিয়ে বিরোধও অনেকাংশে কমে আসবে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল রেকর্ড রুমের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত আট কোটির বেশি খতিয়ান ডিজিটাল ডাটাবেজে যুক্ত হয়েছে। তবে এই হিসাবের মধ্যে বিভিন্ন জরিপের খতিয়ানের পাশাপাশি ই-নামজারির মাধ্যমে তৈরি ও হালনাগাদ হওয়া রেকর্ডও রয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাইজেশন প্রকল্পের পরিচালক পারভেজ হাসান জানান, দেশের সব খতিয়ান সরকারি ব্যবস্থার আওতায় অনলাইনে আনার লক্ষ্যে ডাটা এন্ট্রির কাজ চলছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় ইতোমধ্যে ১১টি উপজেলায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ হয়েছে।

তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে সারা দেশে এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য একটি ক্রয় প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হলে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করা যাবে।

প্রকল্প পরিচালকের মতে, সব খতিয়ান অনলাইনে পাওয়া গেলে জমিজমা নিয়ে মানুষের দৈনন্দিন বিরোধ কমতে পারে। নাগরিকেরা ঘরে বসেই নিজেদের জমির রেকর্ড খুঁজে বের করতে পারবেন। এতে বিভিন্ন দপ্তরে ঘোরাঘুরি এবং তথ্য সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা কমবে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনলাইন সার্ভে খতিয়ানের ডাটাবেজে বর্তমানে প্রায় পাঁচ কোটি ১২ লাখ থেকে পাঁচ কোটি ১৩ লাখ খতিয়ান রয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় পাঁচ কোটি ১২ লাখ খতিয়ান অনলাইনে উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ই-নামজারি ও অন্যান্য ভূমিসেবা ডিজিটাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাটাবেজে রেকর্ডের সংখ্যা বেড়েছে।

ই-নামজারিতে বাড়ছে নাগরিক সুবিধা

দেশের উপজেলা ও সার্কেল ভূমি অফিস এবং ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে ই-নামজারি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৫১৬টি উপজেলা ও সার্কেল ভূমি অফিস এবং ৩ হাজার ৪৬৭টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে এ কার্যক্রম চলছে। অনলাইনে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ লাখ নামজারি মামলা নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।

জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর সরকারি রেকর্ডে নতুন মালিকের তথ্য হালনাগাদ করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়াই নামজারি। জমি কেনা, উত্তরাধিকার বা অন্য কোনো বৈধ উপায়ে মালিকানা পরিবর্তনের পর নিয়ম অনুযায়ী নামজারি করতে হয়। ডিজিটাল ব্যবস্থায় আবেদন, নথি যাচাই, মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত জানার কাজ সহজ হয়েছে।

আগে খতিয়ান সংগ্রহ বা নামজারির জন্য অনেক ক্ষেত্রে একাধিকবার ভূমি অফিসে যেতে হতো। প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ, আবেদনের অবস্থান জানা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে সময় ব্যয় হতো। অনলাইন ব্যবস্থার ফলে এসব কাজের অনেকটাই এখন ঘরে বসে করা সম্ভব হচ্ছে।

রাজস্ব আদায়েও ডিজিটাল সেবার প্রভাব

ভূমি উন্নয়ন কর অনলাইনে আদায়, ই-পর্চা ও ই-নামজারি ডিজিটাল ভূমিসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ১৫ মে পর্যন্ত ভূমিসেবা ব্যবস্থার বিভিন্ন খাতে রাজস্ব জমার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কোটি ৭০ লাখ হোল্ডিংয়ের তথ্য ম্যানুয়াল পদ্ধতি থেকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় এক কোটি ১০ লাখ অনলাইন দাখিলা দেওয়া হয়েছে। ই-পর্চার মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত সরকারের কোষাগারে জমা হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।

জমি কেনার আগে রেকর্ড যাচাই সহজ

ডিজিটাল খতিয়ানের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো জমির রেকর্ড সংগ্রহ ও প্রাথমিক তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ। অনলাইনে খতিয়ান খুঁজে জমির দাগ নম্বর, রেকর্ডভুক্ত মালিকের নাম এবং জমির পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সার্টিফায়েড কপির জন্যও আবেদন করা সম্ভব।

জমি কেনাবেচার আগে ক্রেতার জন্য রেকর্ড যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল ব্যবস্থায় খতিয়ানের তথ্য সহজে পাওয়া গেলে জমির মালিকানা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাইয়ের প্রাথমিক কাজ দ্রুত করা যায়। একইভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির রেকর্ড খোঁজা, পুরোনো দলিলের সঙ্গে খতিয়ানের তথ্য মেলানো এবং নামজারির প্রস্তুতি নেওয়াও সহজ হয়।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও এ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। বিদেশে অবস্থান করেও অনলাইনে জমির রেকর্ড অনুসন্ধান করা গেলে দেশে থাকা স্বজনদের ওপর নির্ভরতা কমবে। তবে পরিচয় যাচাই, অনুমোদিত আবেদন ও সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম মানতে হবে।

স্বচ্ছতা বাড়াতে প্রয়োজন নির্ভুল তথ্য

ডিজিটাল রেকর্ড ব্যবস্থায় ভূমিসংক্রান্ত নথি সংরক্ষণ ও অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া আরও সুশৃঙ্খল হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আবেদন, ফি পরিশোধ ও নিষ্পত্তির তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকলে সেবার অগ্রগতিও পর্যবেক্ষণ করা যায়। এতে নথি খুঁজে পেতে বিলম্ব, কাগজপত্র হারিয়ে যাওয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে ডিজিটাল সেবার সুফল পুরোপুরি পেতে ওয়েবসাইট ও সার্ভারের নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম, তথ্যের নিরাপত্তা, সহজ ব্যবহারব্যবস্থা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো নাগরিক নিজের জমির তথ্য খুঁজে না পেলে, ভুল তথ্য সংশোধন করতে না পারলে কিংবা আবেদনের অগ্রগতি জানতে ব্যর্থ হলে প্রত্যাশিত সুবিধা ব্যাহত হতে পারে।

ভূমি অফিস নির্মাণ ও ড্রোন জরিপের পরিকল্পনা

ডিজিটাল সেবার পাশাপাশি ভূমি অফিসগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সারা দেশে ১ হাজার ৩৩০টি ইউনিয়ন ভূমি অফিস এবং ১৫০টি সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণের লক্ষ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির উদ্যোগ রয়েছে।

এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভূমির নথি সংরক্ষণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মপরিবেশ এবং নাগরিকদের সেবা গ্রহণের সুযোগ উন্নত হতে পারে। বিশেষ করে পুরোনো কাগজের নথি নিরাপদে সংরক্ষণ করা গেলে সেগুলো ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ সহজ হবে। কারণ, ডিজিটাল রেকর্ডের নির্ভুলতা অনেকাংশে নির্ভর করে মূল নথির পাঠযোগ্যতা ও সঠিক সংরক্ষণের ওপর।

এ ছাড়া ভূমি জরিপে ড্রোন ব্যবহারের বিষয়েও ভাবছে সরকার। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে জরিপের সময় কমানো এবং তথ্য সংগ্রহের নির্ভুলতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে জমিসংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধানের সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সরকারি সম্পত্তি রক্ষা, রাজস্ব মামলা পরিচালনা এবং ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ কমাতেও ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা সহায়ক হতে পারে। সরকারি জমির রেকর্ড সহজে অনুসন্ধান করা গেলে দখল, রেকর্ডের অসংগতি এবং মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী বলেন, ভূমিসেবাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করতে সরকার ডিজিটাল কার্যক্রম সম্প্রসারণে কাজ করছে। সব খতিয়ান পর্যায়ক্রমে অনলাইনে আনা সম্ভব হলে নাগরিকেরা ঘরে বসেই জমির রেকর্ড সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে পারবেন। এতে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি ভূমি অফিসে মানুষের যাতায়াত কমবে।

তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনার সুফল নিশ্চিত করতে তথ্যের নির্ভুলতা, নিয়মিত হালনাগাদ, নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের সহজে সেবা পাওয়ার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পুরোনো রেকর্ড সংরক্ষণ ও যাচাই, ভুল তথ্য সংশোধন এবং নাগরিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হবে। সূত্র: বাসস

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে।