এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : বাড়ির উঠানে শত শত নারী-পুরুষের ভিড়। ভাঙাচোরা একটি ঘরের দরজায় বসে বাবার জন্য অপেক্ষা করছে আয়শা। পাড়া-প্রতিবেশীদের কেউ তাকে কোলে নিচ্ছেন, কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু নিষ্পাপ শিশুটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সবার মুখের দিকে।
‘আমার আব্বুরে ক্যাডায় যেন মাইরা লাইছে। আমার আব্বু আর আইবো না, আমারে কোলে নেব না। যারা আমার আব্বুকে মারছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই’। গণমাধ্যমকর্মীর সামনে এসব কথাই বারবার বলছিল পাঁচ বছরের শিশু আয়শা আক্তার। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে অটোরিকশা নিয়ে বের হয় আয়শার বাবা আলাউদ্দিন। এরপর রাতে তার আর খোঁজ মেলেনি। মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করে তাঁর পরিবার।
কোথাও না পেয়ে ৪ জানুয়ারি দেবিদ্বার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন আলাউদ্দিনের স্ত্রী রাজিয়া আক্তার। এরপর নিখোঁজের ১২ দিন পর সোমবার সকালে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানাধীন হিরাপুর এলাকার বুড়ি নদীর কুচুরিপানার ভেতর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত মো. আলাউদ্দিন (২৮) কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের মো. সুলতান আহমেদের ছেলে।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বিকালে নিহত আলাউদ্দিনের বাড়ি গিয়ে দেখা গেছে, দুই বছরের শিশু আদনানকে কোলে নিয়ে স্ত্রী রাজিয়া আক্তারের গগণবিধারী কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এক পাশে বসে কাঁদছে আলাউদ্দিনের বৃদ্ধ মা ছোটনা বেগম।
পাশে বসা বাবা সুলতান আহমেদও শোকে স্তব্ধ।
নিখোঁজের ১২ দিন পর মঙ্গলবার দুপুরে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ গ্রামে পৌঁছালে পরিবার ও স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। নিহতের বাবা বৃদ্ধ মো. সুলতান আহমেদ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এই ছেলেটাই ছিল আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। অটোরিকশা চালিয়ে সে তার স্ত্রী-সন্তান আর আমাদের খরচ চালাত। এখন আমার তিনটা অবুঝ নাতি-নাতনিকে কে দেখবে?’
নিহতের স্ত্রী রাজিয়া আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার স্বামীর শরীরে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আঘাত নেই, শিয়াল কুকুরে আমার স্বামীর চোখ তুলে ফেলছে, কান ছিঁড়ে ফেলছে। কারা এত নির্দয়ভাবে আমার স্বামীকে কষ্ট দিয়ে মারল? একদিন কাজ করলে ঘরে চাউল আসে, না করলে আসে না। এখন এই তিনটা সন্তান নিয়ে আমি কীভাবে বাঁচব?’ কার কাছে হাত পাতবো। তিনি আরো বলেন, ‘যারা আমার স্বামীকে এভাবে হত্যা করেছে, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
প্রতিবেশী মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আলাউদ্দিনের কারো সঙ্গে কোনো শত্রুতা নেই। সে শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিল। এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত ও দ্রুত বিচার দাবি করছি।
এ বিষয়ে দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘নিখোঁজের ১২ দিন পর মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানা এলাকার একটি নদী থেকে আলাউদ্দিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশ উদ্ধারের পর তার পরিবারের লোকজন লাশ শনাক্ত করার পর মরদেহটি কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় বাঙ্গরা বাজার থানায় হত্যা মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।