মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭, ০৯:৪৭:২৭

মুসলিম নারীরা তাদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত : তসলিমা নাসরিন

মুসলিম নারীরা তাদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত : তসলিমা নাসরিন

তসলিমা নাসরিন : ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ৫ জনের মধ্যে ৩ জন বিচারক তিন তালাকের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। মুসলিম মেয়েরা তিন তালাক চায় না। তিন তালাকের আইনকে সুপ্রিম কোর্ট এখন অনায়াসে বিদেয় করতে পারে।

অনেকে, আমার মনে হচ্ছে, ভেবে নিয়েছে, তিন তালাক বিদেয় হওয়া মাত্র মুসলিম নারীরা সমানাধিকার পেয়ে যাবে। অনেকে জানে না, যে স্বামী তালাক দিতে চায়, সে যদি মুখে ‘তালাক তালাক তালাক’ বলে তালাক দিতে না পারে, সে পুরসভার চেয়ারম্যান, অথবা এই জাতীয় কাউকে এই মর্মে চিঠি পাঠিয়ে দেবে যে সে তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ইচ্ছে পোষণ করছে।

ব্যস চিঠি পাওয়ার কিছুদিনের মধ্যে তার তালাক হয়ে যাবে। সরকারি নথিপত্রে তার নাম খোদিত হয়ে যাবে যে সে আর বিবাহিত নয়। কোনও পুরুষের জন্য এ মোটেও কঠিন কাজ নয়। যে লোক স্ত্রীকে ভালোবাসে না, তালাক দিতে চায় স্ত্রীকে, সে আজ হোক কাল হোক তালাক দেবে। মুখে না দিতে পারলে লিখে দেবে। মৌখিক তালাক অবৈধ, তাই বলে লিখিত তালাক তো অবৈধ নয়।

কোনও মেয়ের কি সেই লোকের সঙ্গে এক ছাদের তলায় বাস করতে ভালো লাগবে যে তাকে ঘৃণা করে, যে তাকে তালাক দিতে চায়? তবে তিন তালাক অবৈধ হয়ে গেলে অসুবিধে তো কিছু নেই কোনও পুরুষলোকের! অনেক পদ্ধতি আছে তালাকের। এক পদ্ধতিতে দেওয়া সম্ভব নয় তো অন্য পদ্ধতিতে দেবে। স্বামী-নির্ভর-মেয়েরা তালাককে বড্ড ভয় পায়।
 
ভারতীয় মুসলিমরা, অনেকে বিশ্বাস করে, পাকিস্তানি আর বাংলাদেশি মুসলিমদের চেয়েও সভ্য, শিক্ষিত, সেকুলার। যদি তাই হয়, তবে ধর্মের এমন কঠোর কঠিন আইন ভারতীয় মুসলিমরা আজও পুষে রাখছে কেন। যতই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চেয়েছে ভারতের বৈষম্যবিরোধী মানুষ, ততই বেঁকে বসেছে ভারতীয় মুসলিম, ততই তারা তাদের ধর্মের আইন, নারীর সমানাধিকার যে আইনে লঙ্ঘিত হচ্ছে, আকড়ে ধরে।

তিন তালাকের এই আইনকে তো পাকিস্তান আর বাংলাদেশ কয়েক দশক আগেই দূর করে দিয়েছে। মুসলিম আইনের সংশোধন হয়েছে, সত্যি বলতে কী, আমার জন্মেরও আগে। এখন তিন তালাক বললেই আর তালাক হয় না। স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইলে রীতিমত লিখিত তালাক দিতে হয়। সরকারি অফিসে লিখিত তালাকের প্রমাণ থাকতে হয়।

তালাক দেওয়ার অধিকার সভ্যতা বিরোধী নয়, বরং তালাক দেওয়ার অধিকার না থাকাটা সভ্যতা বিরোধী। অনেক সময় পুরুষের তালাক দেওয়ার অধিকার থাকলেও নারী সে অধিকার পায় না। এটি অত্যন্ত নোংরা নিয়ম। এই নিয়মটিকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করা জরুরি। দু’জন মানুষের যেমন পছন্দ করে বিয়ে করার অধিকার আছে, দু’জন মানুষের তেমনই অপছন্দ করে তালাক দেওয়ারও অধিকার আছে।

আমি কখনই তালাকের বিপক্ষে নই। তালাক যদি দিতে কারও ইচ্ছে করে, সে স্বামীর দিক থেকে হোক, স্ত্রীর দিক থেকে হোক, অনায়াসে যেন দিতে পারে। তালাকের প্রক্রিয়া খামোকা জটিল ক’রে মানুষের ভোগান্তি বাড়ানো মোটেও উচিত নয়। আমি যখন তালাক দিয়েছিলাম, মনে আছে পদ্ধতিটা খুব সহজ ছিল।

নোটারি পাবলিকের কাছে গিয়ে বললাম, আমি অমুককে তালাক দেবো। ব্যস নোটারি পাবলিকের লোক আমাকে একটা কাগজে সই করতে বললেন। সই করে, কিছু টাকা দিয়ে, উঠে চলে এলাম। ওটিই তালাক। পুরো ব্যাপারটি মিনিট কয়েকের ছিল। এরকমই হওয়া উচিত। বছরের পর বছর অশান্তির সংসারে পড়ে থাকার কোনও মানে হয় না।

ভারতের মুসলিম আইনে বিয়ে, তালাক, সন্তানের দায় দায়িত্ব, উত্তরাধিকার ইত্যাদিতে নারীর সমানাধিকার নেই। সমানাধিকারের ভিত্তিতে তৈরি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি গ্রহণ করতে মুসলিমদের আপত্তি। এত যুগ যদি লেগে যায় সামান্য এক তিন তালাকের আইন নিষিদ্ধ করতে, তবে আর কত যুগ লাগবে এক এক করে বাকি বৈষম্যের আইন নিষিদ্ধ করতে?

বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করো, উত্তরাধিকার সমান করো! ভালো কাজ তড়িঘড়ি করাই তো ভালো। অবশ্য তড়িঘড়িই বা বলি কেন! সপ্তম শতাব্দির আইন একবিংশ শতাব্দিতে বদলাতে চাওয়া কি দেরি হয়ে যাওয়া নয়? বৈষম্যের সবগুলো আইন পেছনে ফেলে সমানাধিকারের আইনের দিকে নির্দ্বিধায় এগিয়ে যাওয়াই তো বুদ্ধির কাজ।

মুসলিমরা কি বৈষম্যের আইন বদলাতে চায়-- এই প্রশ্ন করলে অধিকাংশই উত্তর দিয়েছে, চায় না, তারা বৈষম্য ভালোবাসে। কিন্তু একটি গণতন্ত্রে যে বৈষম্যের আইনের কোনও জায়গা থাকতে পারে না, এ কথা কে কাকে বোঝাবে! মুসলিম পুরুষরা বৈষম্যের আইন বদলাতে চাইলে বদলাবে, তা না হলে যা কিছু যেমন আছে তেমনই থাকবে। এটিই ভারতবর্ষের সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের কারণে মুসলিম নারীরা তাদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে একটি গণতান্ত্রিক দেশে। মানবাধিকার কর্মীদের তো কই এ নিয়ে সরব হতে দেখি না!

তিন তালাক বিলুপ্ত হলে, আগেও বলেছি, এখনও বলছি, মেয়েদের সত্যিকার কোনও লাভ নেই। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ছাড়া মাথা উঁচু করে চলার অন্য কোনও পথ মেয়েদের খোলা নেই। শিক্ষা এবং স্বনির্ভরতা সবার জন্য জরুরি। সবচেয়ে বেশি জরুরি মেয়েদের জন্য, যেহেতু এ দুটোর অভাবে মেয়েরা নির্যাতন ভোগ করছে। অনেকে মনে করে তিন তালাক বিলুপ্ত হলে স্বামীর লাথি গুঁতো খেয়েও, স্বামীর ঘরেই স্বামীর স্বামীসন্তানের সেবাদাসী হয়ে মাথা গুঁজে থেকে যেতে পারার সৌভাগ্য মেয়েদের হবে। স্বামী ছাড়া আর তাদের কেউ সহায় নেই। কিন্তু মেয়েরা কি নিজেই নিজের সহায় হতে পারে না?

ভারতবর্ষের অধিকাংশ মানুষ তালাকবিরোধী। স্বামী স্ত্রীর তালাক হয়ে গেলে সন্তান ফেলে অথবা সন্তান নিয়ে কোথায় কোনও জঙ্গলে যাবে স্ত্রী! যেহেতু যাওয়ার জায়গা নেই, তাই আত্মত্যাগ করো, তাই স্বামী, সে যত অত্যাচারী আর পাষণ্ডই হোক না কেন, কিছুতেই যেন তোমাকে তালাক না দেয়, সেভাবে মন যুগিয়ে চলো। এই তো!

না, এ কোনও সমাধান নয়। এ বরং সমস্যা। সমাধান ওই একটিই: শিক্ষিত এবং স্বনির্ভর মেয়ে পুরুষতান্ত্রিক পরিবার আর সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের মতো চলতে পারার মনের জোর অর্জন করবে। যতদিন না করবে, ততদিন থেকেই যাবে সমস্যা। এক সমস্যা থেকে আরেক সমস্যা জন্ম নেবে। আরেক সমস্যা থেকে আরেক।

সপ্তম শতাব্দির আইন একবিংশ শতাব্দিতে মেনে চলতে যারা চায়, তারা নিশ্চয়ই নিতান্তই নির্বোধ। এই নির্বোধদের নিয়েই আমাদের নিত্য বসবাস। এই নির্বোধদের অনুভূতিতে আঘাত না দেওয়ার উদ্দেশেই চলছে তোষণের রাজনীতি, চলছে নারীবিদ্বেষী ধর্ম আর ধর্মীয় আইনের চর্চা।

কেউ কেউ বলছে, তিন তালাক বাতিল করতে যাওয়া এক জগদ্দল পাথরের গায়ে সামান্য একটু টোকা দেওয়া। এ নিতান্তই প্রথম পদক্ষেপ। এক পা এক পা করেই এগোতে হবে। তাহলে তাই হোক, এক পা এক পা করেই সভ্যতা এগোক। আমারই বেঁচে থাকতে দেখা হবে না কোনও মানববাদী বিপ্লব। সে না হোক, তবু বদ্ধ জলাশয়ে সামান্য তরঙ্গ উঠুক।
এমটিনিউজ/এসএস

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে