এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : মেহেরপুর শহরে একটি ফিশিং লিংকে ক্লিকের ঘটনা ঘিরে সামনে এসেছে সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারণার এক উদ্বেগজনক চিত্র। মোবাইল ফোনে পাঠানো একটি সন্দেহজনক লিংক ইনস্টল করার পর এক ব্যবসায়ীর মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থেকে ২৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ইতোমধ্যে ভুক্তভোগী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, এর পেছনে একটি সক্রিয় সাইবার প্রতারণা চক্র কাজ করছে। মেহেরপুর সদর থানার ওসি তদন্ত শিমুল দাস বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জিডি সূত্রে জানা গেছে, মেহেরপুর পৌরসভার হোটেল বাজার এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী তৌহিদুল আজম (৪৬) গত ৫ মার্চ দুপুরে এ প্রতারণার শিকার হন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওইদিন ফেসবুক মেসেঞ্জারে ‘Live Lex’ নামে একটি লাইভ টেলিভিশন সার্ভারের লিংক পান তিনি। কৌতূহলবশত লিংকটিতে ক্লিক করে অ্যাপটি মোবাইলে ইনস্টল করেন। এরপর থেকেই ফোনে অস্বাভাবিক আচরণ শুরু হয়। সন্দেহ হওয়ায় দ্রুত অ্যাপটি মুছে ফেলে ফোন বন্ধ করে দেন। কিন্তু পরে মোবাইল চালু করার পরও তার ধারণা, অজ্ঞাত একটি ভাইরাস সক্রিয় ছিল। এমনকি ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও পিন লক থাকা সত্ত্বেও ফোনের নিয়ন্ত্রণ অন্য কারও কাছে বলে দৃশ্যমান হচ্ছিল।
ঘটনার দিন বিকেলে তিনি নগদ, রকেট, বিকাশ ও নেক্সাস পেসহ একাধিক মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহার করেন। সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে শহরের একটি রেস্তোরাঁয় ইফতার করতে গেলে আচমকাই দেখতে পান তার ফোনের স্ক্রিনে নিজে নিজেই বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তিনি দ্রুত ফোনটি বন্ধ করে দেন।
পরে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের একটি বুথে গিয়ে টাকা উত্তোলনের সময় স্টেটমেন্ট পরীক্ষা করে দেখেন, তার রকেট অ্যাকাউন্ট থেকে ২৫ হাজার টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। অথচ তিনি নিজে কোনো লেনদেন করেননি।
পরবর্তীতে অনুসন্ধানে জানা গেছে, তার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা পাঠানো হয়েছে একটি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে। অ্যাকাউন্টধারীর নাম দেখানো হয়েছে রেহেনা আক্তার, যার ঠিকানা কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার নয়াচর ঢাকমারকুল এলাকা। তবে তদন্তে উঠে আসে একাধিক অসংগতি। যে সিম নম্বর দিয়ে অ্যাকাউন্টটি পরিচালিত, সেটি নিবন্ধিত রংপুর সদর উপজেলার চন্দনপাট মণ্ডলপাড়া এলাকার শিরিনা বেগম নামে। একই নম্বরের বিকাশ অ্যাকাউন্ট আবার নিবন্ধিত রামুর রেহেনা আক্তারের নামে।
আরও জানা গেছে, নম্বরটি সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১০ জুলাই রাজবাড়ীর বসন্তপুর এলাকায় সক্রিয় ছিল। এরপর থেকে নম্বরটি বন্ধ থাকলেও সংশ্লিষ্ট মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে লেনদেন অব্যাহত রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ভুক্তভোগীর ঘটনার দিন একই নম্বরের অ্যাকাউন্টে ২৫ হাজার টাকা করে মোট সাতটি লেনদেন হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, একই পদ্ধতিতে একাধিক ব্যক্তিকে টার্গেট করা হয়েছে।
কালবেলা প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, প্রতারণায় ব্যবহৃত মোবাইল সেটটির আইএমইআই নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট সিমের আইএমএসআই নম্বর পাওয়া গেছে। একই সিম স্লটে গত তিন মাসে ৭০টিরও বেশি সিম কার্ড ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে, যা স্পষ্টতই একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয়। ফোনটির অপর সিম স্লটে ব্যবহৃত নম্বরগুলোর তথ্য এখনও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী তৌহিদুল আজম বলেন, ঘটনার দিন সিটি ব্যাংকের ঢাকার একটি শাখা থেকে আমার ডাচ বাংলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা ট্রান্সফার হয়। এর কিছুক্ষণ পরেই আমার মোবাইলের মেসেঞ্জারে ফিশিং লিংক আসে। এরপরে আমার সঙ্গে ঘটে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটা। মেহেরপুর সদর থানায় আমি আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিষয়টি নিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করেছি।
তিনি আরও বলেন, প্রথমে ভেবেছিলাম বিষয়টি লজ্জার, কাউকে জানাব না। কিন্তু পরবর্তীতে আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি যাতে বিষয়টি সকলের সামনে আসে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি পায়। মিডিয়াতে ঘটনাটি প্রকাশ হলে সাইবার দুষ্কৃতকারীদের শাস্তির আওতায় আনা সহজ হবে বলেই আমার ধারণা।
এই ঘটনার অনুসন্ধানে নামলে আরও কিছু তথ্য সামনে আসে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। ফিশিং অ্যাপ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ, এমনকি মোবাইলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গ্যালারির ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মত আগেও ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক লজ্জার ভয়ে অনেকেই এসব বিষয়ে মুখ খুলছেন না বা কোনো আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।
তবে কালবেলাকে অন্তত দুই গৃহবধূ জানান, ফেসবুক মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের লিংকে ক্লিক করার পর তারা একই ধরনের ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।
এ বিষয়ে প্রতিবেদক একজন অভিজ্ঞ ইথিক্যাল হ্যাকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ব্যাংকের সাইবার সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, প্রলোভননির্ভর ফিশিং লিংকই এখন সাইবার প্রতারণার প্রধান হাতিয়ার। ব্যবহারকারীদের অজ্ঞতা ও অসতর্কতাকেই কাজে লাগায় প্রতারকরা। তার মতে, হ্যাকাররা যেমন ক্রমেই প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ হচ্ছে, তেমনি সাধারণ ব্যবহারকারীদেরও সচেতন ও প্রযুক্তিবান্ধব হতে হবে।
এ বিষয়ে জেলা পুলিশের বক্তব্য জানতে চাইলে মেহেরপুর জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পার্সন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান বলেন, বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে সাইবার ইউনিট। তাই এ বিষয়ে পুলিশ সুপার বা অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের বক্তব্য না নিয়ে আপনি বরং গোয়েন্দা পুলিশের ওসির বক্তব্য নিন।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মুহাদ্দিদ মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে আমরা মনে করছি, এটি একটি পরিকল্পিত সাইবার প্রতারণা, যেখানে ফিশিং লিংকের মাধ্যমে ভুক্তভোগীর মোবাইলে অননুমোদিত প্রবেশাধিকার নেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীর জিডির ভিত্তিতে ইতোমধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে।